সকাল সাড়ে পাঁচটায় ওঠা। মুখ ধুয়ে যোগব্যায়াম। তারপর পড়াশোনা শুরু স্বামীজির সামনে বসে। দু’ঘন্টা পর সকালের খাওয়া। তারপর বাগানের পরিচর্যা। এরপর স্কুল সাড়ে দশটা থেকে। মাস্টারমশাইরা তখনই আসেন এই আশ্রমে। দেড়টায় দুপুরের খাওয়া। আবার স্কুল সাড়ে চারটে অবধি। তারপর মাঠে খেলা আর সন্ধ্যে সাতটা থেকে আবার পড়াশুনা। রাত নয়টায় রাতের খাওয়া। সাড়ে দশটায় আলো নিভে যাওয়া।
প্রথম তিন মাস বাদে স্বপন দেখলে অর্জুন অনেক রোগা হয়ে গেছে। কিন্তু বিমর্ষ ভাবটা নেই। যথেষ্ট উদ্দীপ্ত দেখাচ্ছে।
স্বামীজি ছিলেন না। মালার খুব কষ্ট হল। স্বপনকে বলল – “এ কী চেহারা হয়েছে ছেলের? এরপর তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। ওকে নিয়ে চলো।” অর্জুন বলল – “আমি ভাল আছি।”
দো কাঁদো স্বরে মালা নিজের আবেগ সামলে বলল – “আমাদের কথা মনে পড়ে না তোর? একটাও ফোন, চিঠি কিছুই দিসনি।”
অর্জুন বলল – “ওটা বারণ আছে। কিন্তু আমি ভাল আছি।”
অবুঝ মালা বলল – “বাবু, তুই ভাল থাকতেই পারিস না। এই পরিবেশে তুই কোনোদিন থেকেছিস? তোর এই অহেতুক কষ্ট আমি মা হয়ে দেখতে পারছি না।”
অর্জুন চুপ করে রইল।
বেরোনোর সময় স্বামীজির সঙ্গে দেখা হল। আজ কিন্তু মুখটা হাসি হাসি করে বললেন – “কোনো চিন্তা নেই। ও ভালই আছে। আমি চেষ্টা করব ওর একটি বছর যদি বাঁচানো যায়। আমাদের স্কুল থেকেই দেবে মাধ্যমিক কিন্তু আমি ওকে রেগুলার ক্লাসে নিয়ে যাব না এখন। ওকে অনেকটা সময় এখানে থেকে মেকআপ করতে হবে।”
স্বপন উদগ্রীব হল – “কী বুঝলেন স্বামীজি? হবে? পাশ করবে?”
স্বামীজি হাসলেন – “আমি কখনো আশা ছাড়ি না। দেখা যাক। অনেক খাটতে হবে। অনেকটা সময় চলে গেছে। বেশি সময় ব্যয় করতে হবে। ভিতর থেকে পাল্টাতে হবে। দেখা যাক। চেষ্টা করলে কিছুটা তো এগোবে।”
বছর ঘুরে গেল। এখন অর্জুন সাঁতার কাটতে পারে। গাছের পরিচর্যা করতে পারে। রান্না করতে পারে ভাত, ডাল, ভাজা, অমলেট। মাছের ঝোল এখনও শেখেনি। বাসন মাজতে পারে। ঘর ঝাঁট দিতে পারে, মুছতে পারে। সাধারণ মোটা চালের ভাত, ডাল আনন্দ করে খেতে পারে। আনন্দ দুঃখের অনুভূতি বন্ধুদের সাথে ভাগ করতে পারে। প্রথম প্রথম কষ্ট হয়েছে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে। শুলেও ঘুম আসত না। আসতে আসতে অন্ধকারের একটানা পাখার শব্দ, বাইরে খুটখাট শব্দ পায়। আর অসুবিধা হচ্ছে না। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে দেখেছে আসে পাশের ছোট বড় বন্ধুরা উঠে পড়ছে। ভোরবেলা উঠলে অনেকটা সময় পাওয়া যায়। কাজের সময়, পড়ার সময় বেড়ে যায়। পরিশ্রম করার ইচ্ছে সব সময় জাগ্রত থাকে। স্বামীজি দুজন শিক্ষককে ঠিক করে দিয়েছেন। ওঁরা নিয়ম করে ক্লাস নাইনের সব সাবজেক্টগুলো পড়াচ্ছেন মিলে মিশে। তিনি খেয়াল রাখছেন। বিকেলের মাঠের ফুটবল খেলাটাই নিশ্বাস ফেলার মত জায়গা। প্রতি রাতে একবার স্বামীজি ডাকেন। কী পড়েছে, কী করেছে সেটা জানতে চান।
একদিন স্বামীজি ডেকে অর্জুনকে বললেন – “তোমাকে একটা জিনিস দেখাব।” একটা বইয়ের পাতা খুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর চোখ বুজে রইলেন কিছুক্ষণ। আবার চেয়ে রইলেন। এইরকম তিনবার করলেন তারপর বইয়ের পাতা অর্জুনের দিকে দিয়ে। বললেন – “যেখান থেকে খুশি জিজ্ঞাসা করো প্রশ্ন।” আশ্চর্য্য, পুরো পাতার কোথায় কী লেখা আছে গড়গড় করে বলে গেলেন। বললেন – “চোখের দৃষ্টি দিয়ে মস্তিষ্কে ছাপ ফেলো। যত তীক্ষ্ণ হবে দৃষ্টি ততই জোরালো হবে ছাপ। এই ছাপ গভীর হবে যদি চোখ বুজে সেই ছবিকে দেখে লিখে ফেলতে পারো। সকালে পড়বে রাত্রে লিখে ফেলবে। আটকে গেলে আবার দেখো। কিন্তু শুরু থেকে লেখো। কেউ তোমাকে থামিয়ে রাখতে পারবে না। দেখবে অনেক কম সময় বইয়ের পড়া মনে থাকছে। হয়ে যাচ্ছে।”
অর্জুন অবাক হল। এরকম কেন স্কুলে শেখানো হয় না? স্বামীজি বললেন – “এই বছরে মাত্র আট মাস আছে। তুমি সামনের বছর মাধ্যমিকে বসার প্রস্তুতি নাও। আমি সব রকম ভাবে তোমার ভিতরের আগুন জ্বালিয়ে রাখতে সাহায্য করব। তোমার কাজ হচ্ছে বিশ্বাস করা তুমি পারবে। আর যত পারবে বন্ধুকে পড়াবে। দেখবে তাতে তোমার নিজের পড়া হয়ে যাচ্ছে। এখন শুতে যাও।”
অর্জুনের শেষ অবধি এক বছর নষ্ট হয়েছে প্রথাগত বিদ্যা অর্জনের পথে। আশি পার্সেন্টেজ নম্বর পেয়েও পাশ করেছে মাধ্যমিক। সঙ্গে সঙ্গে এও বিশ্বাস করেছে যে পুঁথিগত বিদ্যা শুধু স্বীকৃতি দেয়। উন্নত জীবনে কোনো কাজে আসে না। কাজে আসে তাকে বিলিয়ে দিতে পারলে। কাজে আসে অন্যকে পড়ালে। স্বপন ও মালার আজ আনন্দের দিন। কিন্তু অর্জুনের মুখ ভার বর্ষার মেঘের মত। আশ্রমের বারান্দায় কিছুক্ষণ বসার পর অর্জুন এল। মালা পিঠে হাত রেখে বলল – “কতদিন তুই নেই। বাড়িটা খালি। বাবু চল, বাড়ি চল। জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখেছিস?”
অর্জুন মাথা নেড়ে জানাল সে বেঁধে রেখেছে সব। মালা বলল – “তোর পছন্দসই পদ রান্না করেছি। পাড়ার বন্ধু রঞ্জন, পল্টুরা প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে তুই কবে আসবি।”
স্বামীজি এসে ঢুকলেন ঘরে। স্বপন আর মালা উঠে দাঁড়াল। স্বামীজি ওদের বসতে বললেন। অর্জুনকে বাইরে যেতে বললেন। অর্জুন চলে যাবার পর বললেন – “আপনারা ওকে নিয়ে যেতে পারেন। ওর অন্তরের গভীরে যে মানুষটা আছে তার একটা প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া গেছে। আসতে আসতে ওর মধ্যে আপনারা পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন। ও বাহ্যিক চলমান সংসারের পথ আর বাইবে না। মনে হবে স্রোতের ভিন্ন মুখে ওর যাত্রা। বিচলিত হবেন না। ওটা ভিতরের মানুষটাকে সঠিক পথ দেখানোর জন্যে।”
মালার চোখ জলে ভরে এল। স্বপন কেমন উদাস হয়ে গেল। মালা বলল – “ও কি আমাদের সাথে থাকবে না? সেই পুরনো অর্জুনকে কি আর দেখতে পাব না? ও তো আমাদের একমাত্র ছেলে।”
স্বামীজি বললেন – “আপনার ঘড়ি চলছে না বলে এসেছিলেন। ঘড়ির ভিতরটা ঠিক করে দিয়েছি। তবে আগের মত চলবে না সে। তার জীবন আর মানুষ সম্বন্ধে মূল্যবোধটা ঠিক করে দিয়েছি। পাশ করা, ডিগ্রি পাওয়া এগুলো ভেবে দেখবেন কোনো কাজের নয়। নিয়ে যান। আজ আপনাদের খুব আনন্দের দিন। কিন্তু মনে হয় ওর কাছে নয়।” এতটুকু বলে একটু উদাস হয়ে গেলেন।
অর্জুন বাড়ি চলে গেল। কিন্তু বাড়িতে মন বসল না, মনে পড়ে রইল বাগানের মাটিতে, পুকুরের জলে, খেলার মাঠে আর অফুরন্ত আনন্দের আঁধার সেই বন্ধুদের কাছে। মনে হয় বার বার ওদের অনেকেরই বাবা মার সন্ধান নেই। কারুর মা আছে তবে বাড়িতে রেখে পড়াতে পারে না। মাঝে মাঝেই যায় স্বামীজির কাছে। বসে থাকে সামনে। স্বামীজির আদেশে ছোটদের পড়ায়। নিজের ক্লাসের বন্ধুদের নিজের পড়া বোঝায়। উনি বলেছেন নিজের পড়া যতই অন্যকে বোঝাবে ততই তোমার বিচার বিবেচনা, নিজের পড়া মনের গভীরে ঢুকে যাবে। হচ্ছেও তাই।
কলেজ পাশ হল। স্বামীজি একদিন নিভৃতে ডাকলেন। বললেন – “কী চাও? তোমার মা বাবা তোমার পথ চেয়ে বসে আছে। তুমি এই আশ্রম পরিত্যাগ করো। চাকরি বাকরি করো। সংসার করো। মা বাবা খুশি হবেন।”
অর্জুন এমনটা আশা করেনি। মুখটা করুণ হয়ে এল। বলল – “স্বামীজি, এই আশ্রম আমাকে ছাড়তে বলবেন না। এটা আমার মনের আনন্দের জায়গা। আমি সংসার করতে চাই না। আমি আপনার সাথে থাকতে চাই।”
খুব চিন্তিত মুখে বললেন – “সেটা হয় না। তোমার মা বাবার অবলম্বন তুমি। ওঁরা তোমাকে ঘিরেই বাঁচেন। তুমি আর এসো না। মনকে সরাতে হলে আসা বন্ধ করতে হবে।”
“স্বামীজি এতটা নির্মম আপনি হবেন না।”
“দুটো জিনিস তো একসঙ্গে চলতে পারে না।”
“আমি মা বাবাকে দেখব। আমি সংসারী হব না। আপনার মত কাজ করতে চাই। শিশুদের সঙ্গে থাকতে চাই।”
“তোমার মা বাবা রাজি হলে আমার সাথে দেখা কোরো। তখন দেখব। এখন বাড়ি ফিরে যাও।”
বাবা মা চায় না অর্জুন আর ফিরে যাক। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরি করাই ঠিক ছিল সবার মত। মনের দুঃখ নিয়ে ফিরে এসে একটা চাকরি ও কিছুদিন করল। কিন্তু মনকে সরাতে পারল না। সেই ঘুরেফিরে আশ্রমের ছেলেগুলোর মুখ ভেসে বেড়ায় সামনে। বাড়িতে থাকলেই মন চলে যেতে চায় ওদের কাছে। সেই পুকুর, বাগান, থাকবার জায়গাতে। কত তফাৎ এই জীবনের সঙ্গে। এই বাহুল্য, অনায়াস জীবন বার বার ওদেরই কথা মনে করায়। বার বার মনে হয় কত তফাৎ জীবন ধারণের। অথচ চামড়ার নিচে সব এক। অর্জুনের মনের মধ্যে থেকে আশ্রম, স্বামীজি অনেক দূরে চলে যেতে পারত কিন্তু ওই কয়দিনের আশ্রম আর স্বামীজির সঙ্গ তাকে বার বার টেনে নিয়ে যেতে লাগল আশ্রমের দিকে। এবং শেষ অবধি মা বাবার অনুমতি নিয়েই চলে এল। কথা দিয়েছে মাঝে মাঝে যাবে বাড়িতে । ফিরে এসে মনে হল এ যেন মুক্তির জায়গা। এইটাই ওর জায়গা।
ঠুক ঠুক দরজার কড়া নাড়া শুনে অর্জুন দরজা খুললে। “স্বামীজি? আপনি? এত ভোরে?”
হাসি হাসি মুখে বললেন – “চলো। বেরিয়ে পড়ি।”
“এখন? এত ভোরে কেন? ভাল করে আলো ফোঁটে আশ্রমের ঘুমিয়ে আছে।”
“এইটাই তো ত্যাগের সময়। জেগে ওঠার সময়। এগিয়ে যাবার সময়। সময় বসে থাকবে না। প্রতি মুহূর্ত দামী। ওরা থাকুক ঘুমিয়ে।”
অর্জুনের মুখ করুণ হয়ে এল। কারুর কাছে বিদায় নেওয়া হয়নি। কেউ জানল না চলে গেলাম, ওরা কিছু মনে করতে পারে। স্বামীজির স্বরে সেই চিরকালীন কথা – “কোনো পিছুটান নয়। একদিন সব ফেলেই যেতে হয়। চাও আর না চাও। যাওয়া চিরকালীন সত্য।”
“কোথায় যাব স্বামীজি? কবে ফিরব?”
“যাব দুর, হয়তো কোনোদিন আর আসব না। সামনে যে কাজ আছে তার দিকে তাকাও।”
“কী কাজ স্বামীজি?”
“অনেকদূর যাব, ট্রেনে করে যেতে হবে। এখানকার কাজ শেষ। খবর এসেছে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি পরিবেশে এরকম আশ্রম গড়ে তুলতে হবে। অনেক অনাথ ছেলে, গরীব ছেলে বসে আছে আমাদের মুখ চেয়ে।”
“কিন্তু স্বামীজি জমি লাগবে, বাড়ি করতে হবে, আরো….।”
বারান্দায় পায়চারি করতে করতে বললেন – “যেদিন এখানে এসেছিলাম তখন এখানে কিছুই ছিল না। মানুষকে বোঝাতে হবে। জমি মিলবে আশা আছে। বড় মহারাজ বলেছেন। আমি কর্মী। শুধু কাজ করে যাওয়াটাই আমার ধর্ম।”
কয়েকটা জামা, প্যান্ট ও প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে অর্জুন প্রস্তুত হয়ে যায়। আশ্রম ছেড়ে পথে নামে স্বামীজি আর অর্জুন। পরে রইল আশ্রম, মা, বাবার শহর। কবে ফিরবে জানা নেই। স্বামীজির হাত শক্ত করতে হবে। নতুন আশ্রম গড়ে তুলতে হবে। এইটাই জীবনের একমাত্র কাজ হয়ে উঠুক। কতগুলো ইস্পাতের মেরুদন্ডের আঁতুড়ঘর হোক নতুন আশ্রম। যেখানে পড়াশোনা শেখানো হয় কিন্তু আসলে নির্ভেজাল, উদ্যোগী, পরিশ্রমী মানুষ তৈরি হবে। এর থেকে মহৎ কাজ আর কী আছে? স্টেশনের পথে হাঁটতে হাঁটতে আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। সামনে স্বামীজি দৃপ্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। সঙ্গে সামান্য একটা লাঠি আর একটা ঝোলা। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে প্রথম সূর্যের আলো এসে ওঁর দেহ, মুখ আর গেরুয়া বসন সোনার রঙে মাখিয়ে দিচ্ছে। যেন আগুনের গোলা চলে যাচ্ছে লাল মাটি বেয়ে। যেন এই পৃথিবীর কেউ নন তিনি। এক কাজ শেষ, অন্য কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। পিছিয়ে পড়া মানুষকে টেনে তুলতে হবে। এ এক ভীষণ কষ্টসাধ্য কাজ। স্বামীজি সেই কাজে অর্জুনকে নিয়েছেন। হাঁটতে হাঁটতে আনন্দে দু’চোখ ভিজে আসছে। এই জন্যেই মনুষ্য জীবন। পরের জন্যে, শিশুদের জন্যে এমন কর্মযজ্ঞের সাথে থাকতে পারলেও জীবনের একটা মানে হয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবন দেবতাকে নমস্কার করে অর্জুন।





এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান