মৌলীনাথ গোস্বামী
কাঁধের রুক্ষ অফিসব্যাগটা চৌকির একপাশে নামিয়ে পশ্চিমের জানলাটা হাট করে খুলে দিল অম্লান। সারাদিন জানলাগুলো দম আটকে বসে থাকে। ঘর গুমোট হয়ে যায়। তাই সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে ওর প্রথম কাজই হল জানলার পাল্লাগুলোকে মুক্তি দেওয়া। আর তা দিতেই ওর ঘেমো মুখের ওপর এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস হুড়মুড় করে এসে পড়ল।
দু’সপ্তাহ হল এই ভাড়ার ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে অম্লান। তিনতলার জানলা। মাটির সাথে ছোঁয়াছানি কম। আশেপাশে সমানে সমানে টক্কর দেওয়ার মতো দ্বিতীয় কোনো পড়শী জানলা নেই। তাই পশ্চিমের জানলাটার সারাদিনের যত খুনসুটি, ঠেলাঠেলি, সবই বাতাসের সাথে। জানলার নিচে রাস্তা, একদিক থেকে এসে আর একদিকে চলে গেছে।
জানলার মুখোমুখি, রাস্তার ঠিক ওই পারে কিছুটা ফাঁকা জমি। বাড়ি ওঠেনি। তার বাঁ পাশে লাইটপোস্টের গা ঘেঁষে কয়লার ডিপো। ডানপাশে একটা অনেক পুরোনো বাড়ি। ছোট। একসময় হলুদ রং ছিল দেওয়ালে। এখন বিবর্ণ। জায়গায় জায়গায় স্যাঁতা পড়া। দরজা জানলাগুলোও কোনো এক কালে সবুজ ছিল। এখন ময়লা বসে কালচে হয়ে গেছে। যেদিন থেকে এই ফ্ল্যাটে এসেছে অম্লান, খেয়াল করেছে, বাড়িটার সদর দরজায় সবসময় তালা ঝোলে। কেউ থাকে না। কেউ থাকতে আসেও না। কেউ কোনোদিন ছিল কিনা তাও জানে না সে। প্রতি সন্ধ্যায় লাইটপোস্টের মরা বাল্বের আলো কোনোক্রমে ঘষটে ঘষটে মন খারাপের মত থম মেরে থাকা বন্ধ বাড়িটা অবধি আসার চেষ্টা করে। আর তারপরেই অন্ধকার। তার ভেতর দিয়ে উত্তরমুখী রাস্তা কোনো অজানা উত্তরের সন্ধানে সন্ধ্যের আঁধারে প্রতিদিন হারিয়ে যায়।
জামাকাপড় ছেড়ে স্নান করে বেরিয়ে আসে অম্লান। ইন্ডাকশান হিটারে চা বানায়। লিকার চা। ঝঞ্ঝাট কম। তারপর কাপ হাতে জানলার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে রাস্তার চলাচল দেখে। টোটো, বাইক, মটরগাড়ি, পথচারী… আর তারপরেই ওই বন্ধ বাড়িটায় চোখ আটকে যায়। অন্ধকারের শেকড়বাকড় কেমন যেন অক্টোপাসের মত গিলে খায় বাড়িটাকে, বাড়িটার গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাঁকড়া পেয়ারা গাছটাকে, আর বাড়িটার অনড় পায়ের কাছে গজিয়ে ওঠা পুটুসের ঝোপঝাড়কে। শুধু অন্ধকার বিজবিজ করে। কেবল পেয়ারা গাছের গুঁড়ির কাছে, তুলসী মঞ্চের আদলে গড়া মাটির ঢিপিতে একটা প্রদীপ একা একা জ্বলে। তিনতলার জানলা থেকে প্রদীপের ক্ষীণ শিখা দেখতে পায় অম্লান। শিখাটা কাঁপে না, নেভে না। কী এক অমোঘ প্রত্যয় নিয়ে করুণার মত ম্লান হয়ে একভাবে জ্বলে। আশ্চর্য লাগে অম্লানের। কে রোজ নিয়ম করে অন্ধকারে আলো জ্বালে এসে? কে?
এক কাপ চা শেষ করতে আর কত সময় লাগে! শেষ চুমুকের সাথে জানলার মৌতাতও শেষ হয়ে যায়। উঠে পড়ে অম্লান। রোজই অফিস ফেরত কিছু না কিছু কাজ থাকে ঘরে। হয় সারাদিনের নোংরা জামাপ্যান্ট কাচা, নয় আলু-পেঁয়াজ আনতে যাওয়া, অথবা চা পাতা, চিনি, হলুদ গুঁড়ো। অম্লান নিজে রান্না করে। রান্না বলতে বেশিরভাগ দিনই ভাতে ভাত আর ডিমসেদ্ধ; এক আধ দিন ঘন ডালসেদ্ধ। হোটেলের খাবার ওর সহ্য হয় না। অবশ্য কোনো কোনোদিন নিচে নেমে একটু হেঁটে গলির মুখে একটা দোকান থেকে রেডিমেড রুটি নিয়ে আসে। এইসব করতে গিয়ে প্রদীপ নিভে যাওয়ার শেষ দৃশ্যটা আর দেখা হয়ে ওঠে না। শনিবার অফিস থেকে সোজা বাড়ি যায় অম্লান। রবিবার কাটিয়ে, সোমবার অফিস সেরে সন্ধ্যায় ফ্ল্যাটে ঢোকে। রাতে খাওয়ার পরে থালা বাসন মেজে যখন জানলায় এসে সিগারেট ধরায়, তখন প্রদীপও দেখা যায় না, মাটির ঢিপিও না। পেয়ারা গাছের তলায় চাপ চাপ অন্ধকার থকথক করে। নিঃসঙ্গ নিস্তব্ধ পাগলের মত একটা কালো শূন্যতা বাড়িটার সামনের সুনশান দাওয়ায় টহল দেয়।
সকালে অফিস যাওয়ার তাড়া। ঘুম থেকে ওঠার পর কয়েক ঘন্টা সময়, ঝড়ের মত বাথরুম, রান্নাঘর, শোয়ার ঘরে দাপাদাপি করে একসময় ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে নেমে, কাঁধে অফিসব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তারপর অনেক সন্ধ্যায় আবার ফিরে আসা। এসে পশ্চিমের জানলায় এক কাপ চায়ের মেয়াদ হাতে বসা। বন্ধ বাড়িটার পায়ের কাছে প্রদীপটা আবার জ্বলে ওঠে। অম্লান বসে ভাবতে থাকে, কে জ্বালাল? কেউ তো জ্বালায়! কে সে? কেন জ্বালায়? সড়কের ওপর দিয়ে হুশ করে চলে যায় মোটরগাড়ি; কেউ সাইকেল চালিয়ে অন্ধকারে ক্রিং ক্রিং বেল বাজাতে বাজাতে চলে যায়। শনশন করে গড়াতে গড়াতে টোটো পার হয়। কেউ হেঁটে পেরিয়ে যায়। একলা প্রদীপের দিকে ফিরেও তাকায় না কেউ। অবিচল দীপ্তি নিয়ে প্রদীপ নিজের মত একা একা পোড়ে। কার মঙ্গলকামনায় জ্বলে সন্ধ্যার এই অখণ্ডজ্যোতি? যে বাড়ির ভেতরে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে আলো জ্বলে ওঠে না, শাঁখ বাজার শব্দ ভেসে আসে না, যে বাড়ির জানলায় দরজায় শবের শান্ততা বিরাজ করে, সেখানে কার জন্য জ্বলে ওই প্রদীপ? আলোটা নিশির ডাকের মত টানে অম্লানকে। ভাবায়। অদ্ভুত লাগে ওর। কিন্তু কোনও সদুত্তরে আলোকিত হয় না তার কৌতূহলী মন। রোজই ভাবে একদিন সন্ধের মুখে পেয়ারা গাছের নিচে এসে দাঁড়াবে…
সেদিন হঠাৎই হাফ ছুটি হয়ে গেলে অফিস থেকে দুপুর দু’টোর পরেই বেরিয়ে পড়ে অম্লান। অফিসের পাশেই একটা হোটেলে মশলা ধোসা খেয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ফ্ল্যাটে ঢুকতে ঢুকতে বিকেল। বাইরের নিভু নিভু আলো ধিকিধিকি জ্বলছে। সারাদিন রোদ্দুরে জ্বলে জ্বলে ছাই হয়ে এসেছে সময়। ধূসর রং ধরছে সময়ের গায়ে। পশ্চিমের জানলা খুলতেই চোখ আটকে গেল ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটার গায়ে। পাশে পেয়ারা গাছের গোড়ার কাছে পোড়ামাটির ঢিপি। কোনোদিন তুলসীমঞ্চ ছিল। বর্তমানে জলে হাওয়ায় গলে কাঠামোর সূক্ষ্মতা হারিয়ে জড়পদার্থের মতো জবুথবু বসে আছে। ঢিপির কোল শূন্য। প্রদীপ নেই।
সঙ্গে সঙ্গে মনে খেলে গেল, কে প্রতিদিন প্রদীপ জ্বালায় দেখতে হবে। চায়ের কাপ হাতে ঠায় বসে রইল অম্লান। সময় সন্ধে হল। আকাশ থেকে কালো চাদর নেমে এসে ঢেকে দিল গোটা এলাকা। লাইটপোস্টে বাল্ব জ্বলে উঠল। দূরের বাড়িগুলোর অস্পষ্ট জানলায় একটা একটা করে আলো ফুটতে শুরু করল। বন্ধ বাড়িটা চোখের সামনে ডুবে গেল আলকাতরা পুকুরে।
একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল অম্লান। দূর থেকে অন্ধকারকে ভালো করে বোঝা যায় না। বুঝতে গেলে নিজেকেও অন্ধকার হতে হয়। টিউবলাইটের আলোয় তিনতলার জানলায় বসে অম্লানের চোখে ঠিক ঠাহর হচ্ছিল না রাস্তার ওপারের আঁধারের উপাখ্যান। তাছাড়া যেই প্রদীপ জ্বালাক, তাকে দেখতে গেলে কাছে যেতে হবে। এতদূর থেকে কিছুই জানা বা বোঝা যাবে না। চায়ের কাপখানা রান্নাঘরে নামিয়ে রেখে, লাইট নিভিয়ে, দরজায় তালা মেরে নিচে নেমে গেল অম্লান। তারপর পশ্চিমের রাস্তায় এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে একখানা সিগারেট ধরাল।
প্রদীপ জ্বলেনি। বাড়িটা ভূতের মতো দাঁড়িয়ে। তাকিয়ে গা ছমছম করে উঠল অম্লানের। যেন রহস্য উন্মোচন করবে বলে সেও দাঁড়িয়ে আছে। ঘনঘন সিগারেট টানছে। বাড়িটাকে ঘিরে জমে থাকা অন্ধকারে এতটুকু চিড় ধরেনি।
হঠাৎ মনে হল যেন অন্ধকারের একটা টুকরো নড়ে উঠেছে। ভালো করে তীক্ষ্ণ চোখে একভাবে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সে। একটা ছায়া। মানুষের। উত্তর দিকের অন্ধকার ফুঁড়ে যেন পেয়ারা গাছের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর ধীরে উবু হয়ে বসে পড়ল গলে যাওয়া টেরাকোটার তুলসীমঞ্চের সামনে। আর দাঁড়াল না অম্লান। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে সেও ছায়ামূর্তির মতোই নিঃশব্দে পা ফেলে রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়াল খসখসে অন্ধকারে চাপা পড়া বাড়িটার সামনে; ছায়ামূর্তির পাশে, একটু তফাতে। পায়ের তলায় শুকনো ডালপালা একটু মটমট করে উঠে চুপ করে গেল। বাতাসে জমে থাকা জমাট কালো যেন নিজেকে খানিক আলগা দিল। ধুসরতায় মোড়া দৃশ্যপট কিছুটা স্পষ্ট হল। একটা লোক। গায়ে সাদাটে স্যান্ডো গেঞ্জি। কোমরের নিচের অংশটা অন্ধকারে গলে মিশে গেছে। ঘাড় গোঁজ করে বসে আছে মাটির ঢিপির দিকে মুখ করে। ফ্যাঁস করে দেশলাই জ্বালাল লোকটা। তার কয়েক মুহূর্ত বাদেই দ-হয়ে বসে থাকা লোকটার পায়ের কাছে জ্বলে উঠল ছোট্ট একটি প্রদীপ। জ্বালিয়ে প্রদীপ শিখার দিকে একভাবে তাকিয়ে রইল সেই ছায়ামানুষ। প্রদীপের শিখার টাটকা হলদেটে আলোয় লোকটার মুখ চকচক করছিল। অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষ। কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। অম্লান যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, লোকটা যেন গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেনি। কে এই মানুষটি? কোথায় থাকে? কেন এখানে প্রদীপ জ্বালায়?
বেশ কিছুক্ষণ একভাবে চুপ করে বসে থাকার পর উঠে দাঁড়ায় মানুষটি। অম্লানও নড়ে ওঠে। এক অদম্য কৌতূহল নিয়ে কাছে এগিয়ে যায়।
“আপনিই রোজ প্রদীপ দেন এখানে?” জিজ্ঞেস করে।
লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকায়। আস্তে করে বলে, “হ্যাঁ।”
“এই বাড়িতে কেউ থাকে না, না? সবসময় তালা দেখি।”
“থাকত একসময়। এখন থাকে না।”
“কোথায় গেছে সবাই?”
“সবাই নয়। একজন।”
“কে?”
“সরযূবালা।”
“কোথায় গেছেন?”
“অন্ধকারে।” ঘড়ঘড়ে গলায় ডান হাতের তর্জনী আকাশের দিকে তুলে বোঝাতে চাইল মানুষটা। অম্লান ইঙ্গিতটা বোঝে।
“আপনি এই বাড়িতে থাকতেন?”
“নাঃ। থাকা আর হল কই। ওর বাড়িতে মানল না।” প্রদীপটার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল লোকটা। যেন প্রদীপটাই সরযূ নামের মহিলাটি। “ওরা গোঁড়া ব্রাহ্মণ, আর আমরা কাজী মুসলমান। সরযূ বিয়ে হয়ে এপাড়ায় চলে এল, এই বাড়িতে। সে আজ ষাট বছর আগের কথা।”
“আপনার বাড়ি? আপনি থাকেন কোথায়?”
“একটু দূরে। হেঁটে বিশ মিনিট।”
“রোজ আসেন?”
“আজ দশ বছ্ছর হয়ে গেল আসছি। সন্ধের নমাজ শেষ করে এইখানে আসি। সরযূকে দেখে যাই। একটা প্রদীপ জ্বালি। এই তুলসীতলা সরযূ বানিয়েছিল।” এক গাঢ় মমতা মাখানো গলায় কথা বলছিল মানুষটা। “তবে আর মনে হয় বেশিদিন আসতে পারব না। সরযূর ডাক শুনতে পাই। অন্ধকারে ডাকে আমায়। অন্ধকার ডাকে আমায়। আসি বাবা….” গুটি গুটি পায়ে সামনের অন্ধকারের দিকে হাঁটা দেয় ন্যুব্জ এক দেহ। অম্লানকে স্তম্ভিত অবস্থায় দাঁড় করিয়ে একসময় অন্ধকার হয়ে যায় মানুষটি।
অম্লান তাকিয়ে থাকে নিশ্চল প্রদীপশিখার দিকে। কীসের জোরে শিখাটি এমন অবিচল জ্বলে থাকে, পরিষ্কার হয়ে যায় অম্লানের কাছে। মনে হয় যেন সরযূবালা বসে আছে তুলসীমঞ্চে। সারা শরীর থেকে দ্যুতি ঠিকরে বেরোচ্ছে। সেই একরত্তি আলোটিকে জ্বলে থাকার অশেষ শক্তি জুগিয়ে চলেছে একটি মানুষের নিঃশব্দ প্রেম – অসমাপ্ত অথচ অনির্বাণ। মানুষটা আজও প্রদীপের ভেতরে সরযূবালাকে অনুভব করে, দেখতে পায়। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল অম্লানের। গলার কাছে কী একটা যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল নামহীন আশ্চর্য মানুষটার কথা মনে করে। এমনও ভালবাসা হয়! এভাবেও ভালবাসতে পারে মানুষ?




এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান