লটারি

“তুমি আবার শুরু করেছ?” 

ঘড়িতে সবে আটটা সতের। চায়ের কাপটাতে মেজাজি চুমুক বসিয়ে খবরের কাগজখানা ওল্টানো শুরু করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি শ্রী নীলকন্ঠ ব্যানার্জি, ওরফে নীলুবাবু। এমন সময় পাকানো বলের মতো কিছু একটা জিনিস ঠকাস করে তার কোলের ওপর এসে পড়ায়, এমন চমকে উঠলেন যে আরেকটু হলেই গরম চা চলকে একসা হতো। চোখ তুলে দেখেন সামনে সাক্ষাৎ রণচন্ডী রূপে দাঁড়িয়ে আছে নিরূপা, দুচোখে যেন ভাঁটার আগুন জ্বলছে। নীলুবাবু ঢোঁক গিললেন, ত্রিশ বচ্ছর সংসার করে এ রূপ তার হাড়ে হাড়ে চেনা হয়ে গেছে। 

কোলের দিকে তাকিয়ে দেখেন জিনিসটা আদপে এক বান্ডিল লটারির টিকিট, গার্ডার দিয়ে রোল পাকানো। ‘সর্বনাশ’ নীলুবাবুর গলা টা শুকিয়ে আসে…কোনোরকমে কাষ্ঠহাসি হেসে বলবার চেষ্টা করেন…”ইয়ে…মানে…”

“আবার লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? নিজেকে বেশী সেয়ানা ভাবো, না? তিনকাল গিয়ে এককালে এসে ঠেকলে, এখনো তোমার…”

– “শোনো শোনো”… নীলুবাবু মরিয়া হয়ে ডিফেন্স সামলানোর চেষ্টা করেন…

-“রাখো তোমার ওসব ঢপের কেত্তন…আজ তোমারই একদিন কি আমার ই একদিন…বলি আজ অবধি ক হাজার কোটি টাকা জিতেছ শুনি? ঘাটে ওঠার বয়স হয়ে এলো, তাও বাবুর টাকার খাই কমলো না?”

– “ব্যাপার কি? সাতসকালে এসব…” ইতিমধ্যে পাশের বেডরুমের দরজা খুলে চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এসেছে ছেলে আর বৌমা। 

– “দেখ, তোর বাবার কাণ্ড দেখ…আবার লুকিয়ে লুকিয়ে লটারি কাটা শুরু করেছে…”

নীলুবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, এবার মা-বেটার যৌথ জ্ঞান শুনতে হবে। 

ঘন্টাখানেক পরে বউ আর ছেলের সাঁড়াশির জোড়া ফলা থেকে উদ্ধার পেয়ে নীলুবাবু কাঁচুমাচু মুখে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে গুম মেরে বসে রইলেন। চা জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, মুখ ঝামটা খাবার ভয়ে আরেক কাপ চাওয়ার আর সাহস পেলেন না। টিকিটের বান্ডিল টা ছেলে বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছে।

একেবারে ছাপোষা মধ্যবিত্ত মানুষ বলতে যা বোঝায়, নীলুবাবু আদপে তাই। বাসের পাদানিতে বাদুড়ঝোলা হয়ে অফিস যাওয়া ছাড়া জীবনে অন্য কোনো দুঃসাহসিক কাজ করেছেন বলে শোনা যায়না। রেসের মাঠ, ওলি পাব, নাইট ক্লাব – এসবের ধারেকাছেও তাকে কোনদিন দেখা যায়নি। একটা বয়স অবধি ছবি তোলার নেশা ছিল, সেসব ও অনেককাল আগে ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু ছাড়তে পারেননি যেটা সেটা হলো এই লটারির নেশাটা। সেই কোনকালে একবার পাঁচশো টাকার পুরষ্কার জিতেছিলেন, তারপর থেকেই নেশাটা রয়ে গিয়েছে। এই নিয়ে বাড়িতে প্রচুর অশান্তি হয়েছে, নিরূপা পইপই করে মাথার দিব্বিটিব্বি দিয়েও ছাড়াতে পারেননি। একরকম নিরূপার ভয়েই টিকিট গুলো লুকিয়ে রাখা শুরু করেছিলেন নীলুবাবু। বই এর তাকে সঞ্চয়িতার পেছনে সযত্নে রাখা ছিল বান্ডিল টা, নিরূপা কি করে খুঁজে পেল কে জানে! পুরো সকালটাই মাটি করে দিল। ‘ধুত্তোর’ বলে উঠে দাঁড়ালেন নীলুবাবু। টেবিলের ড্রয়ার টা খুলে নীল ডায়েরিটা আর পেন বার করে হিসেব করতে বসলেন। একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।

নীলুবাবু যখন হিসেব শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন, তখন তার মুখ থমথমে। সপ্তাহে দুটো করে, মানে মাসে ৮ টা টিকিট। বছরে ৯৬ টা। মানে মোটের ওপর গত ৩০ বছরে প্রায় হাজার তিনেকের কাছাকাছি লটারির টিকিট কেটে ফেলেছেন নীলুবাবু। টাকার হিসেব ধরলে দাঁড়ায় হাজার তিরিশের কাছাকাছি। এদিকে আজ অবধি প্রাইজ জুটেছে সাকুল্লে বত্রিশশো টাকা মতো।

‘এতগুলো টাকা লস’ – অঙ্কে সুপন্ডিত নীলুবাবুর।মাথা টনটন করতে লাগলো। জিভের তলা টা কেমন যেন শুকিয়ে আসছে। টেবিলে রাখা বোতল টা থেকে ঢকঢক করে আধ বোতল জল খেয়ে ফেললেন নীলুবাবু। তারপর দরজার পেছনে ঝোলানো জামা টা গায়ে গলিয়ে হনহন করে বেরিয়ে পড়লেন…হরেন বলে রেখেছে আজ সকালে নবরাত্রি বাম্পার স্পেশাল ১০ টা টিকিট রেখে দেবে ওনার জন্য…এবার মেরে দিলেই দশ লাখ…

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Blog at WordPress.com.

Up ↑