মধুমুরলী

 নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী

এখন গল্পটি শুনতে পারেন অডিও স্টোরি হিসেবেও – পাঠে অঙ্কনা নায়ক

একটা পুকুরের নাম মধুমুরলী? তাও আবার পলাশীর যুদ্ধেরও একশো বছর আগেকার? অবাক হয়েছিল প্রান্তর। একটা ফুডওয়াকে এসে জনা কুড়ি মানুষ তখন একত্রিত হয়েছিল ওই পুকুরের সামনে। সোশাল মিডিয়ার একটা জনপ্রিয় খাদ্যপ্রেমীদের গ্রুপ আয়োজন করেছিল এই ফুডওয়াক। বারাসাতের প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখা ও সেইসঙ্গে আড্ডা, আলাপ পর্ব আর দেদার খাওয়া দাওয়া। প্রান্তর ওই গ্রুপ মিট এ গিয়েছিল কারণ আজকাল তার পুরনো লেখালেখির ভূতটা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। লেখালেখির সূত্রে অনেক দাদা দিদিও এখন জুটে গেছে ওর। তারাই সবাই জোর করেছে ওকে, যেতেই হবে। অতএব বিরাটি থেকে বারাসাতে ছুটে এসেছিল সে। যদি কিছু নতুন প্লট পাওয়া যায়, এই ভেবেই ও শেষপর্যন্ত ওখানে গিয়েছিল।

আয়োজকদের এই অভিনব উদ্যোগ অবশ্য ব্যর্থ হয়নি। দেখার পর থেকেই কেন যেন এক ধরণের আকর্ষণ বোধ করেছে প্রান্তর ওই পুকুরটার উপর। তার মনে হয়েছিল আশ্চর্য একটা গল্প লিখবে সে ওই পুকুরটাকে নিয়ে। তাই আরও কিছু তথ্য হাতের নাগালে পেতে ও আরও একটু বিশদে জানতে সে আজ কাঁধের ঝোলাব্যাগে পেন-কাগজ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সঙ্গে উদ্দাম ঝোড়ো হাওয়া। বাজারের ব্যাগটা রান্নাঘরের সামনে নামিয়ে রেখেই আবার বেরিয়ে পড়ল প্রান্তর। মা তখন পিছন ফিরে একমনে বসে তরকারি কাটছে।  মায়ের তাকে দেখতে পাবার আগেই ওখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল প্রান্তর। জায়গাটা ওকে এখন যেন টানছে। পুকুরের পাড়ে এসে শরীর যেন একেবারে জুড়িয়ে গেল। কী ঠাণ্ডা হাওয়া। একটা বড় করে শ্বাস নিল প্রান্তর। পাড় কিছুটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে। জল খুবই গভীর। এককালে বারাসাতের উপর থেকে বয়ে যেত সুখাবতী আর লাবণ্যবতী নদী। দুই নদীর জল কোনো এক খালের মধ্যে দিয়ে নাকি এই পুকুরে এসে পড়ত। তাই নীচেরতল খুবই গভীর এই পুকুরের। বেশি গভীর বলে এই পুকুরের জলে খুব একটা কেউ নামে না।

প্রান্তর পা ছড়িয়ে পুকুরের কাছে ভেজা ঘাসের উপরেই বসে পড়ল। শরীর জুড়ে ক্লান্তি ছাড়াও আরও কী যেন আছে এখানকার বাতাসে, কেমন ঘুম পাচ্ছে তার। অবসন্নও লাগছে। সকালে বাজার যাবার আগে মা ডিমরুটি করে দিয়েছিল। সেটা এখন পেটের একেবারে নীচে পড়ে গেছে। খিদে পেয়েছে প্রান্তরের। সে চারপাশে তাকালো এখানে উদ্বাস্তুদের কলোনি আছে। তবে এই জায়গাটা আশ্চর্য শান্ত। দু একটা টিনের ছাউনি দেওয়া একতলা বাড়ি। অনেক বাড়ির মাথায় মাটির টালিও বসানো আছে। গৃহস্থরা দু’একটা লাউ কুমড়ো লতিয়ে দিয়েছে চালে। পুকুরে কচুরিপানা হয়েছিল, তুলে একধারে উঁচু করে রাখা আছে। বেশ স্বচ্ছ পরিষ্কার জল। প্রান্তর একটা পত্রিকায় পড়েছিল। কচুরিপানা জলের দূষণ নিজের শরীরে টেনে নেয়। নাহলে নাগরিক জীবনের কত ক্লেদ আর দূষণ জমে এইসব ওয়াটার-বডিগুলোতে। এরাই তো নগরের কিডনি। জলে থাকা কচুরিপানাগুলো অনেকটা রক্ষা করেছে পুকুরটাকে। বসে বসে ভাবতে থাকে প্রান্তর এখন সেই সুখাবতী নদী   কোথায়? লাবণ্যবতী এখন একটা দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্যবাহী নালাতে পরিণত হয়ে মধ্যমগ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে গেছে। প্রাচীন মধ্যমগ্রামের নাম অনেককাল আগে ছিল চণ্ডীপুর। বর্তমানের বারাসাতও পাঁচটি প্রধান নগর বা পুর নিয়ে গঠিত হয়েছিল একসময়– হৃদয়পুর, বনমালীপুর, চন্দনপুর, প্রসাদপুর, হরিহরপুর, নিশ্চিন্দিপুর। আগেকার বারাসাত ছিল একটা বিশাল বিস্তৃত এলাকা। ভাগীরথীর পূর্ব উপকূল অর্থাৎ দমদম, বরানগর ইত্যাদি থেকে ব্যারাকপুর, বনগাঁ ও বসিরহাট হয়ে বাংলার সাতক্ষীরা এবং একেবারে সাগর পর্যন্ত এর পরিধি ছিল। জগত শেঠের বারোজন পরিজন বা শেঠেরা এসে এই জায়গায় তাঁদের বসতি স্থাপন করেন। তাঁরাই চারদিকে বড় বড় পুকুর কাটিয়েছিলেন। সেই প্রাচীন পুকুরের একটি বারাসাতে শেঠপুকুর নামে এখনও বর্তমান। বারোজন শেঠ, সেই থেকে নাম হয়েছে বারাসাত। কেউ বা বলেন বারো ভুইঞাদের জমিদারী ছিল সেই থেকেই নাম হয়েছে বারাসাত।

হঠাৎ খুব জোরে বৃষ্টি শুরু হতেই প্রান্তর সচেতন হল। এই ভেজা মাটিতে সে কেমন করে এতক্ষণ বসেছিল? এবার সে উঠে গিয়ে সামনে নতুন গড়ে ওঠা একটা শনি মন্দিরের চাতালে বসে পড়ল। এখানে কি জনমানুষ নেই? কেউ আসে না? সকালবেলা এমন নির্জন কেন জায়গাটা? মন্দিরের থামে হেলান দিয়ে ঝিমোতে লাগল প্রান্তর। তার অসম্ভব ঘুম পাচ্ছে।

একটু পরে ধীরে ধীরে তার ক্লান্তি কেটে গেল। একটা সুখানুভূতিতে নেশাগ্রস্তের মত এবার সে একটা নতুন জগতে প্রবেশ করল। আশ্চর্য! চারপাশটা এখন একেবারে বদলে গেছে তার। সে যেন বেশ কয়েকশো বছর আগেকার পৃথিবীতে চলে এসেছে। আরও আশ্চর্য হল এই যে সামনে একটা টলটলে জলের বিশাল দীঘি দেখতে পাচ্ছে সে। দূরে একটা কাঠের দোতলা বিরাট বাংলো-বাড়ি। বাড়ির বাসিন্দারা হলেনঃ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন মিঃ লামবার্ট ও লেডি লামবার্ট।

ইংরেজ মিলিটারি অফিসার ক্যাপ্টেন লামবার্ট সেই বাংলো বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। বারান্দা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আদিগন্তবিস্তৃত জল। খুব ভোরে লামবার্ট সাহেবের ঘুম ভেঙেছে। পরনে নাইট গাউন। চুরুট খেতে খেতে জলের বুকে ভেসে চলা একটি জেলে নৌকোকে দেখছেন সাহেব। তাঁর জন্য টি-পট সাজিয়ে চা নিয়ে এসেছেন যিনি, তিনি আগে ছিলেন মিসেস হোপ। ইনি বর্তমানে ক্যাপ্টেন লামবার্টের সঙ্গে থাকছেন। আইনি প্রথায় যদিও বিয়ে হয়নি তাদের। লামবার্টের সতৃষ্ণ যৌবন খুঁজে নিয়েছিল সদ্যবিধবা মৃত ক্যাপ্টেন হোপের স্ত্রীকে। মিসেস হোপই এখন লেডি লামবার্ট। অন্তত এদেশে এটাই তার পরিচয়।

সকাল হলেই লেডি লামবার্ট প্রজাদের সুখদুঃখের কথা শোনেন। তাঁর মনে এই নিরক্ষর সরল মানুষগুলোর জন্য অসীম দয়া। চাষী ও তাঁতিদের বেচাকেনার সুবিধার জন্য একটুদূরে একটা খোলা জায়গায় সাহেবের মত করিয়ে হাট বসানোর অনুমতি দিয়েছেন তিনি। এতে গরীব মানুষগুলোর হাতে দুটো পয়সা আসবে। জায়গাটার নাম হয়েছে বিবির হাট, বা কেউ কেউ বলেন হাটখোলা। নিজের বিবি উপাধি শুনে হেসেছেন মিসেস লামবার্ট।

আজকাল কেন যেন ক্যাপ্টেনের মতিগতি ভাল ঠেকছে না তাঁর। তিনি এখন বুঝতে পেরেছেন আদতে লামবার্ট লোকটা হল মদ্যপ এবং লম্পট। একজন গরীব বিধবাকে কফি বানানো শিখিয়ে ঘরে রেখেছিলেন তিনি কয়েকদিন আগে, কিন্তু ক্যাপ্টেন তাকেও ছাড়েনি। মেয়েটার নাম অতসীবালা দাসী। ক্যাপ্টেন সাহেবের কামনার আগুনে নিরীহ মেয়েটাও বলি হয়েছে। তবে ক্যাপ্টেন একেবারে অকৃতজ্ঞ নয়। মেয়েটার খাওয়া পরার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই বাংলোতে এখন দুটি মহিলা নিয়েই থাকেন সাহেব। যেদিন যার কাছে ইচ্ছে রাত কাটান। এই নিয়ে কিছুই বলতে পারেন না, মিসেস লামবার্ট। কারণ তিনিও ওই মেয়েটির মতোই সাহেবের আশ্রিতা। তিনি ভাবেন একদা তাঁর আসল নাম ছিল নী উইবি, তা আজ কোথায় ভেসে গেছে! শীতল ঘাসে ছাওয়া তাঁর নীল আকাশের দেশ ছেড়ে বহুদূরের কোন এক অজানা অচেনা দেশে তিনি পড়ে আছেন একজনের রক্ষিতা হয়ে। তাঁর সত্যিকারের পরিচয় ওই কফি বানানো দাসীর থেকে এতটুকুও আলাদা নয়। বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে তাঁর।

সংসারে একেবারেই মন নেই উইবীর। অতসীর উপরে রাগও নেই তার। ভাবেন মেয়েমানুষের শরীরটাই তার যত সর্বনাশের মূল! বরং সময় পেলে তিনি অতসীবালার সঙ্গে গল্প করেন। বিচিত্র উপকথা আর রূপকথা জানে সে। মেমসাহেব সে সব মন দিয়ে শোনেন। তাঁর এখন একমাত্র নেশা এখানকার মানুষদের সঙ্গে মেশা। আলাপ পরিচয় করা। প্রায়ই পথে বেরিয়ে পরেন তিনি। পরনে লং-কোট, আর মাথায় কালো রংয়ের লম্বা টুপি। লোকজন তাঁকে দেখে সভয়ে পথ ছেড়ে দাঁড়ায়।

বছরের পর বছর থাকতে থাকতে বাংলা ভাষায় বেশ কথাও বলতে পারেন এখন উইবী। তিনি দেখেছেন এ দেশের মানুষেরা সৎ ও সরল আর বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। হিন্দু মন্দিরের ঠাকুরপুজোর ঘন্টা শুনতে খুব ভাল লাগে তাঁর। তবে এখানে মন্দিরে অন্য ধর্মের মানুষেরা যেতে পারে না। তাই দূর থেকেই মন্দির দেখেছেন উইবী। এই পুকুরের পাশেই একটা রাধাকৃষ্ণের মন্দির আছে। কয়েকদিন ধরেই আশ্চর্য নানা গল্প কথা শুনছেন তিনি অতসীবালার কাছে। এই পুকুরের জলে ডুবে নাকি অনেকদিন আগে দুজন মারা গেছিল! গল্পের লোভে অতসীকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি।

অতসী তাঁকে পুকুরের পুরনো গল্প বলছিল। তাঁরা এক মেঘলা বিকেলে তাঁদের বাংলো-বাড়ির কাঠের লম্বা বারান্দায় জলের দিকে মুখ করে বসে গল্প করছিলেন। অতসী বলল,

“সেদিনটা ছিল জ্যোৎস্না রাত্রি। চারদিক ভেসে যাচ্ছে অলৌকিক আলোতে। জমিদার মাধবানন্দ বাড়িতে ছিলেন না সেদিন। তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে তীর্থ করতে গেছিলেন। বাড়িতে একমাত্র বিধবা মেয়ে মধুমালতীকে ঝি চাকরদের কাছেই রেখে গেছিলেন তাঁরা। মেয়ে আচার-বিচার মানে। পথে নিয়মনিষ্ঠা হবে না বলে সে তীর্থেও যায়নি। বাড়িতে তার মুরলীধারী কৃষ্ণ আছেন। তাঁর পুজোতেই সময় কেটে যায় মধুমালতীর। সেই আলোকিত জোছনা রাতে মধুমালতী ঠাকুরপুজো শেষ করে ঠাকুর ঘরের শ্বেতপাথরের মেঝেতে শুয়ে পড়ল। বাড়ির সামনে বিশাল পুকুরের জল চাঁদের আলোয় তখন ঝকমক করছে। হঠাৎ সে স্পষ্ট একটা বাঁশির সুর শুনতে পেল। অপূর্ব সেই সুর শুনে মধু পাগলের মত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর সঙ্গে সঙ্গে দাসীও ছুটল। সে ঘরের বাইরেই শুয়েছিল। পুকুর পাড়ে এসে মধু দেখতে পেল বটগাছের নীচে বসে একটা কালো ছেলে অপূর্ব সুরে বাঁশি বাজাচ্ছে! ঠিক যেন তার মুরলীধরের মূর্তিটা হঠাৎ প্রাণ পেয়েছে! মধু তার কাছে ছুটে গেল। ভুলে গেল লোকলজ্জা আর সমাজের চোখ রাঙানি। সারারাত ছেলেটা বাঁশি বাজালো আর মধু তার কাছে বসে বসে শুনতে লাগল। দাসী ডেকে ডেকে এক সময় ঘরে ফিরে গেল। ভোর হবার আগেই ছেলেটা যেন কোথায় চলে গেল। মধু আর তাকে দেখতে পেল না। এমন করে প্রতিটা রাত বাঁশি শুনে আর দিনে তার মুরলীধারীর সেবা করে কাটতে লাগল।

ক্রমশ মধু যেন কেমন পাগলের মত হয়ে গেল। তার মন আর সংসারে নেই। যেন এই বাহ্যজগতেই সে নেই। সারাদিন তার চোখ পুকুরের পাড়ে সেই কালো ছেলেটাকে খুঁজে বেড়ায়।

কিছুদিন পরেই জমিদার মাধবানন্দ বাড়ি ফিরে এলেন, এবং সবই জানতে পারলেন। সেইরাতে জমিদার গিন্নি মধুকে নিয়ে তাঁর ঘরের দরজা দিলেন, যাতে সে আর বাইরে বের হতে না পারে। রাত হলে বাঁশি বেহাগের সুরে কেঁদে কেঁদে এক সময় মাঝরাতে থেমে গেল। জমিদারের পেয়াদারা কালো বংশীবাদক ছেলেটাকে বাঁশ দিয়ে প্রচণ্ড মারতে লাগল। কিন্তু কয়েক ঘা দেবার পরেই চাঁদের আলোয় ছেলেটা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। পুকুরের জল হঠাৎ ঝিলমিল করে উঠল। ঢেউ খেলে গেল জলের ঢেউয়ের মাথায় মাথায়। ছেলেটা কি তবে জলে ঝাঁপ দিল? মদ্যপ পেয়াদারা সবাই তাই ভাবল। এ ছাড়া আর কী বা হবে? দাসীর মুখে পরদিন সকালে সব জানতে পারল মধুমালতী। কিন্তু সে শুনে কিছুই বলল না, বলার মত অবস্থাও তার নেই। তার চেতনা জুড়ে অহরহ বাঁশির সুর। সে যেন এক অপূর্ব সুরের ভুবনে বন্দি। সেখানে শোকের কোনো স্থান নেই। পরদিন সকালে সে আবার বাঁশি শুনতে পেল। এবার দিনদুপুরে। কালো ছেলের কী সর্বনাশা সাহস! মধু পুকুর পাড়ে ছুটে গেল। তারপর সন্মোহিতের মতো ঝাঁপ দিল জলে। জমিদারের পেয়াদারা ছুটে গেল। ছুটল দাসদাসীর দল। আশ্চর্য! কোথাও পাওয়া গেল না আর মধুমালতীর শরীর, তেমন কালো ছেলেটাকেও কোথাও পাওয়া গেল না। মাধবানন্দ লোকজনকে জলে নামালেন। মাঝিদের চারগুণ পয়সা দিয়ে পুকুরের প্রতিটা কোণ খুঁজলেন। কিন্তু নাহ্! কোথাও পাওয়া গেল না মধুমালতী আর তার সেই বাঁশি বাজিয়েকে। জ্যোৎস্না রাতে তারপর অনেকে নাকি তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখতে পেয়েছিল। দেখেছিল তারা একটি ছেলে এক মনে বাঁশি বাজাচ্ছে আর একটি পরমা সুন্দরী মেয়ে চোখ বুজে তার পাশে বসে আছে। ধ্যানরত। সে যেন তার সমস্ত শরীর মন দিয়ে সুর অনুভব করছে।

খবর কি চাপা থাকে? এরপর রাধাকৃষ্ণের বিশাল একটা মন্দির গড়ে উঠল এই পুকুরপাড়ে। যে মন্দিরের ঘন্টার শব্দ আপনি রোজ শুনতে পান, সেটাই হল ওই মন্দির! জোছনা রাতে আজও ওদের দুজনকে কেউ কেউ দেখতে পায়! তবে যে একবার ওদের দেখে সে আর কখনো ঘরে থাকতে পারে না।”

আশ্চর্য! গল্প শুনে আবেগে দু’চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল মেম সাহেবের। উইবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“আজই তো ফুল-মুন-ডে। আজ আমি মধুমালতী আর তার প্রেমিককে একবার দেখতে চাই!”

শিউরে উঠে চুপ করে গেল অতসীবালা।

সেদিন গভীর রাতে লাম্বার্ট সাহেবের ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেল। তাঁর চোখ গেল বিছানায়। উইবী বিছানায় নেই। টলতে টলতে বাইরে এলেন লাম্বার্ট। দেখলেন শরীরে জ্যোৎস্না মেখে পাগলের মত গাইছে আর নাচছে উইবী। তার চোখ থেকে অবিরল ধারায় জল পড়ছে। সে কখনও মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কখনও শুয়ে পড়ছে। লাম্বার্ট সাহেব ছুটে এসে ধরলেন উইবীকে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরেও যেন বিদ্যুত খেলে গেল।

উইবীর শরীর থেকে বিদ্যুত তরঙ্গের মতো কী যেন এসে লাগল তাঁর শরীরে। তিনি সুর শুনতে পেলেন। অপূর্ব সুরের মূর্ছনায় সমস্ত জগত মুহূর্তে বিস্মৃত হয়ে গেল লামবার্ট সাহেবের কাছে।

টলতে টলতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন সাহেব। পরদিন মস্তক মুণ্ডিত করে সাহেব ও মেমসাহেব দুজনেই বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা নিলেন। একেবারে যেন নতুন মানুষ হলেন তাঁরা।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে মন্দিরের গরাদের ফাঁক দিয়ে। পুকুরের জল এখন যেন গলানো সোনার মতো ঝলমল করছে। হঠাৎ বিস্মরণের জগত থেকে ফিরে এল প্রান্তর। অন্ধকার হয়ে গেছে! কতক্ষণ হয়ে গেল? এবার বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু সমগ্র চরাচর ব্যাপৃত করে কে এমন করে বাঁশি বাজাচ্ছে? বাঁশির সুরে এক আশ্চর্য মায়াবী নেশা ছড়িয়ে পড়ছে প্রান্তরের দেহ ও মনে!


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Blog at WordPress.com.

Up ↑