রোহিত ব্যানার্জী
(১)
“কি বউমা, তোমাদের হল? অর্ককে তাড়া দাও এবার। কী যে করে!” অনিলাভ সকাল সকাল স্নান করে তৈরী হয়ে বসে আছেন। আদরের নাতনিটিকেও তাড়াতাড়ি রেডি করে দিয়েছেন। সে এখন মনের আনন্দে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের বাবা-মায়ের এখনও সময় হয়নি। এদিকে ট্রেনের টাইম হয়ে এল।
আজ তাঁর আর নূপুরের চল্লিশতম বিবাহবার্ষিকী। নূপুর চলে গিয়েছেন তিন বছর হল। নূপুরের সমুদ্র ভাল লাগত। তাই প্রতি বিবাহবার্ষিকীতেই নিয়ম করে তিনি সমুদ্রে নিয়ে যেতেন নূপুরকে। নূপুর যাওয়ার পরেও তাঁর সে অভ্যেস রয়ে গিয়েছে। প্রতি বছর বেরিয়ে পড়েন এই দিনটায়। তাঁর তো দৌড়ঝাঁপের ব্যপার নেই, গিয়ে কেবল চুপ করে বসে থাকা। এই বছর ছেলে জানাল তার নাকি অফিসে কিছু ছুটি পাওনা আছে তাই সেও যাবে বাবার সাথে। সেই ব্যস্ততাই চলছে এখন। আনমনে হাতঘড়ির দিকে চোখ যায় অনিলাভর। সময় ঘুরে যায়।
(২)
চাকরিটা একটু দেরিতেই হয়েছিল অনিলাভর। প্রায় উনত্রিশে এসে পেয়েছিলেন ব্যাঙ্কের চাকরি। তারপরেই যথারীতি মায়ের তাড়না শুরু হয়েছিল বিয়ের জন্য; অনেক খুঁজে অবশেষে মেজমাসির শ্বশুরবাড়ির পাড়ায় খবর পাওয়া গেল একজনের। নূপুরকে তার ছবি দেখে ভাল লাগলেও, অনিলাভ যে খুব রাজি ছিলেন তা নয়; কারণ তিনি কলকাতায় বড় হওয়া মানুষ, সেখানে সুদূর মালদা থেকে পাত্রী আসবে ভেবেই তাঁর মনে সয়নি। তবু গেছিলেন বাবা, মা আর মেজজ্যাঠার সাথে।
সে এক এলাহি আয়োজন; অনিলাভর বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল, তার মধ্যে নূপুরের বাবা-মায়ের ক্রমাগত অনিলাভর সম্বন্ধে প্রশংসা সেটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রায় আধঘন্টা নানা কথা আদান প্রদানের পরে অনিলাভর বাবা বললেন, “এবার তবে পাত্রীকে ডাকুন।”
অনিলাভ পরে নূপুরের কাছে স্বীকার করেছিলেন যে মুহুর্তে সে ঘরে ঢুকেছিল তিনি আর কোনোদিকে দেখেননি। মায়ের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা প্রশ্ন, বাবার সবেতেই মাথা নাড়ানো আর মেজ্জ্যাঠার, “খবরদার একটা কিচ্ছু চাই না আমাদের,” – এসবের মাঝে অনিলাভ কেবল হাঁ হয়ে নূপুরকে দেখেছিলেন।
“অনিলাভ, তোমরা দুজনে গিয়ে একটু কথা বলে নাও,” বাবার দেওয়া ডাকনাম থাকলেও বাবা চিরদিন অনিলাভকে লোকজনের সামনে ভাল নামে ডাকতেন।
“আপনি জানেন তো যে আমি বি.কম. পাস?” ছাদে পৌঁছে অনিলাভর প্রথম প্রশ্নই ছিল এইটা। নূপুর ছিল ইংরেজিতে এম.এ.। তাই কিছুটা দ্বন্দ্বও ছিল অনিলাভর মনে।
“হ্যাঁ। আপনি তো ব্যাঙ্কে চাকরি করছেন।”
“এই এক বছর হল। কলকাতাতেই পোস্টিং। আচ্ছা, কলকাতা তো অনেকদূর আপনাদের এখান থেকে, অসুবিধে হবে না?”
“ভাল কিছুর আগে শুধু অসুবিধে ভাবলে তো এগোনোই যাবে না। সব যখন ভাল হয়েছে, এটুকু মানিয়ে নিতে পারব। আর তাছাড়া ওখানে আমার বেশ কিছু আত্মীয় থাকেন। আমি গেছিও বেশ কয়েকবার। তাই মনে হয় না খুব দূরে যাব।”
“এখানে শুনলাম আপনি ট্যুইশানি করেন।”
“হ্যাঁ, ওই সামনের স্কুলের দশ-বারোটা বাচ্চাকে পড়াই। ভাল লাগে তাই, নিজের পড়াও কাজে লাগে। টাকা পয়সা তেমন কিছু নিই না ওদের থেকে।”
“বেশ তো, আমাদের পাড়াতেও এরকম কিছু একটা করা যাবে।” অনিলাভর কথা শুনে নূপুর হাসে।
কথা ঘোরাতে অনিলাভ জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, আপনার পাহাড় ভাল লাগে নাকি সমুদ্র?”
“সমুদ্র। আপনার?”
“পাহাড়।”
“কারণ জানতে পারি?”
অনিলাভর পাহাড় ভাল লাগে তার কারণ তাঁর জলে ভয়, তিনি সাঁতারও জানেন না। সমুদ্রের ওই শেষ না হওয়া ব্যাপারটা তাঁর কাছে কেমন যেন লাগে। পাহাড়ের চূড়া দেখা যায়, অন্তত তিনি যে ক’টা দেখেছেন; মনে হয় এই তো শেষ, কিন্তু সমুদ্রের যেন শেষ নেই, যতটা চোখ যায় কেবল শূন্য।
অনিলাভর উত্তর এক মন দিয়ে শুনে নূপুর বলেছিল, “তাহলে এই একটা ব্যাপার আমাদের মিলল না দেখছি।”
“আপনার কারণটা যে জানালেন না!”
“সমুদ্র ভাল লাগার কারণ? কী জানি, হয়ত সমুদ্র কম দেখেছি বলে। আবার মনে হয় সমুদ্র বড় সাধারণ, ভীষণ কাছের – মায়ের মত। পাহাড়ের যে বিশাল, গম্ভীর ব্যাপার – সেটা সমুদ্রের নেই। তার জোয়ার আছে, ভাটা আছে, মন খারাপের নোনা জল আছে আবার মন ভাল করে দেওয়া এলোমেলো হাওয়া আছে। প্রতিটা ঢেউয়ের আলাদা আলাদা গল্প আছে।”
হাঁ করে গিলেছিলেন অনিলাভ কথাগুলো। এত সুন্দর করেও যে কেউ কথা বলতে পারে! সেদিন সেই ছাদে দাঁড়িয়েই বুঝেছিলেন যে নূপুরই পারবে তাঁর জীবনকে ব্যাঙ্কের যোগ-বিয়োগ থেকে বের করতে।
“বাবা চলো, আমরা রেডি।” অর্কর কথায় ভাবনায় ছেদ পড়ে অনিলাভর। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে আদরের নাতনিটিকে নিয়ে এগোন।
“দাদান, মা বলছিল তুমি আর আম্মা আজকে বিয়ে করেছিলে!”
“হ্যাঁ তো দিদিভাই, আমি আর আম্মা আজকের দিনে বিয়ে করেছিলাম।”
“ঘোড়ায় চড়ে?”
সজোরে হেসে ওঠেন অনিলাভ। নূপুরের মত গল্প বলার অভ্যেস তাঁর নেই, তিনি পারেনও না। তবু কোনোমতে চালিয়ে দেন নাতনিকে খুশি রাখতে।
(৩)
অর্ক একটা এসি কামরা বুক করেছে সবার জন্য। অনিলাভর মনে নেই তিনি কোনোদিন এসি গাড়িতে চড়েছেন বলে, নূপুরও কোনোদিন এসব ব্যাপারে জোর করেননি। তিনি হয়ত এক-আধবার বলেওছিলেন এসি কামরার কথা, উত্তরে নূপুর বলেছেন, “সবাই তো এক সাথেই পৌঁছব, তাহলে আর আলাদা কী! তাছাড়া ট্রেনে আমার খোলা জানলার হাওয়া খেতে বেশি ভাল লাগে।” কিছুতেই তর্কে এঁটে ওঠেননি তিনি।
অর্ক মোবাইল থেকে ট্যাক্সি ডেকে নিয়েছিল। সেই গাড়ি একদম সময় মত তাদেরকে হাওড়া ছেড়ে দিল। গাড়িতে আসতে আসতে অনিলাভ ভাবছিলেন কত সহজ হয়ে আসছে জীবন। ট্রেনের টিকিট, ট্যাক্সি থেকে শুরু করে সব কিছু মোবাইলে। শুধু চাবিটা লাগাতে হবে বাড়িতে। অর্ক বাড়ির মধ্যে কী একটা মেশিন বসিয়েছে, ঘরে ঢুকে তাকে বললে সেই যন্ত্র ঘরের আলো পর্যন্ত কমিয়ে বাড়িয়ে দেয়, গান চালিয়ে দেয়। অনিলাভর মনে পড়ে এরকম ঘুরতে যাওয়ার আগে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে তাঁদের কিছু ধরাবাঁধা কথা থাকত।
“নূপুর, গ্যাসটা দেখেছ? দরজার তালাটা টেনে দেখেছ তো?”
“হ্যাঁ গো, হ্যাঁ। নাও এবার তাড়াতাড়ি চলো, সাড়ে সাতটার বাসটা না পেলে কিন্তু তখন আবার কুড়ি মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, নয়ত ট্যাক্সির জন্য দৌড়দৌড়ি করতে হবে। তুমি টিকিট নিয়েছ মনে করে? দেখে নাও একবার।”
অনিলাভ মানিব্যাগ খুলে দেখে নিতেন।
“অর্ক, ফ্লাস্কটা অত নাড়িও না, একটু ঠোকা লাগলেই কিন্তু ভেঙে যাবে। এই তুমি কাল ব্যানার্জ্জী দা’দের বলে এসেছিলে তো যে আমরা থাকব না ক’টা দিন?”
অনিলাভর এসব একদম টাটকা মনে আছে। তাঁর বদলির চাকরি তাদেরকে যে কত জায়গায় নিয়ে গেছে আরে কত এরকম ব্যানার্জ্জী বউদি, মিত্রকাকিমা, সিংজি এসেছেন; নূপুরের একটা আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল, যেখানেই যেতেন ঠিক পাঁচদিনের মধ্যে এরকম বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলতেন। আর তাঁরাই ছিলেন ওঁদের এরকম বেড়াতে যাওয়ার সময়ের পাহারাদার।
ট্রেনের কামরায় বসতে বসতে অনিলাভ লক্ষ্য করলেন কামরায় বেশি ভিড় নেই; সপ্তাহের মাঝখানে বলে বোধহয়। দেবযানী, অর্কর স্ত্রী, ব্যাগপত্র যথাস্থানে রাখতে রাখতে মেয়েকে বলল, “মাম্মাম, জল খেয়ে নাও। তারপর টয়লেটে যাব।”
অনিলাভ দেখলেন বাধ্য মেয়ের মত তার নাতনিটি গলায় ঝোলানো বোতল থেকে জল খেতে শুরু করল। অর্ক গেছে কিছু খুচরো খাবার কিনতে, আর অনিলাভ বলে দিয়েছেন খান-তিনেক খবরের কাগজও নিয়ে আসতে। সময়টা কেটে যাবে।
“বাবা, আপনার মাফলারটা এনেছেন তো? এসি গাড়ি আপনার অভ্যেস নেই, ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।”
“হ্যাঁ, এই ব্যাগেই রাখা আছে, দেখি যদি খুব দরকার পড়ে বের করে নেব।”
বলেই মনে পড়ল তিনি চাননি অর্কর স্ত্রী চাকরি করুক। নূপুরকে বোঝাতে গেছিলেন যে এতে নূপুরের ওপরে আরও চাপ পড়বে।
নূপুর শোনেননি; বলেছিলেন, “না, আমিও তো ট্যুইশানি সামলে ঘর-সংসার করেছি। সেও পারবে।” দেবযানী পেরেছে, নূপুরের পরে গোটা বাড়িটা সে আগলে রেখেছে। হঠাৎই অনিলাভর লজ্জা লাগে এসব কথা ভেবে। ভাবেন দেবযানী ভাল আছে তো? অর্ক ছেলে খারাপ নয়, কিন্তু আজকাল তাঁর মনে হয় ওদের দুজনের মধ্যে যেন সব ঠিক নেই। কী জানি! নূপুর থাকলে এসব বুঝতেন; তবে নাক যে গলাতেন না, সেটা অনিলাভ জানেন। তিনিও তাই একটা দূরত্ব রাখেন।
অর্ক এসে পড়তেই ট্রেনের আওয়াজ শোনা গেল।
অনেকদিন পরে সবাই একসাথে যাচ্ছেন, শুধু নূপুরই নেই। অনিলাভ জানলার থেকে বাইরে দেখলেন প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে যাচ্ছে, যারা ছাড়তে এসেছিল তারা রয়ে গেল। অনিলাভ কাগজটা খুলে বসলেন।
“বুঝলে মৌ, প্রতি বছর এরকম একটা-দুটো ট্রেনযাত্রা বাঁধা ছিল আমাদের। হয় মামারবাড়ি, নয়ত কলকাতার বাইরে থাকলে পুজোয় বাড়ি আসা। আর যেই ট্রেন চলতে শুরু করত বাবা পেপার পড়তে শুরু করে দিত। আর মা আমাকে গল্প বলতে শুরু করত; মায়ের কাছে যে কত গল্প ছিল তার হিসেব আমি কোনোদিন পাইনি, শুধু হাঁ করে গিলতাম গল্পগুলো।”
ইতিমধ্যে চা নিয়ে ট্রেনের লোক আসায়, তাকে জলখাবারের অর্ডার দিতে দিতে অর্ক দেবযানীকে এসব বলছিল। “তোমরা বুঝি এর বাইরে আর কোথাও যেতে না?” দেবযানী জিজ্ঞেস করে।
“না, তা নয়। এই অ্যানিভার্সারি হলে কোনো সমুদ্রে – যদিও সবসময় অ্যানিভার্সারিতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হত না; তাছারা দার্জিলিং, ঘাটশিলা এসব আর কী। কিন্তু এই রুটিনটা একই থাকত। বাবা, তোমার মনে আছে সেই পুরীর ঘটনাটা?”
অনিলাভ কাগজের আড়াল থেকে শুনছিলেন সব কথা। ভাবছিলেন অর্ক-দেবযানীদের কথা, এরা কত সাবলীল! তিনি কোনোদিন তাঁর বাবার সামনে এত সাবলীল ছিলেন না; নূপুর ছিল। নূপুর সবাইকে কেমন আপন করে নিত! তিনি একটু দূরত্ব পছন্দ করতেন, এতে তাঁর সুবিধেই হয়েছিল, নূপুর সামলে নিত সব। এই মুহুর্তে নূপুরকে বড্ড মনে পড়ল।
কাগজ থেকে মাথা উঠিয়ে অর্ককে বললেন, “না রে, কোন ব্যাপারটা?”
অর্ক বলে চলে, “আমরা সেইবার পুরী গেছিলাম, বাবা-মায়ের অ্যানিভার্সারি ছিল। এদিকে বাবা একদম জল ভালবাসে না। আর মা তো ভীষণ খুশি সমুদ্র দেখে। আমাকে নিয়ে ছুটল, সে কী দাপাদাপি। আমরা সমানে ডাকছি বাবাকে, কিন্তু বাবা নামবে না, আমাদের জুতো, জামা নিয়ে বসে আছে বীচে। তারপর জোর করে আমরা টেনে নামালাম বাবাকে। আর সেই স্নান করেই বাবার জ্বর এল রাত্রে। মা সেদিন সারা রাত জেগে, লজের ম্যানেজারকে বলে ডাক্তার, ওষুধ সব করল।”
হাঁ করে শুনছিলেন অনিলাভ। অর্কর এত কথা মনে আছে? সত্যি তো, এই ঘটনাটা একদম হারিয়ে যেতে বসেছিল তাঁর মন থেকে। অর্ক অনেকটাই নূপুরের মত হয়েছে। গুছিয়ে কথা বলতে ভালবাসে।
“বাবা, আপনারা বুঝি সব অ্যানিভার্সারিতে সমদ্রেই যেতেন?” দেবযানীর এরকম আচমকা প্রশ্নে অনিলাভ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। ছেলের বউকে এসব নিয়ে কীই বা বলবেন তিনি! বললেন, “তা একরকম বলতে পারো।”
“কিন্তু আপনি তো জলে ভয় পান!”
“আসলে নূপুর, মানে অর্কর মা ভালবাসত, তাই বলতে পারো ওটা একরকম বাঁধাই ছিল।” বলার পরেই লক্ষ্য করলেন দেবযানী অর্কর দিকে আড়চোখে তাকাল। অর্ক ততক্ষণে মোবাইলে মুখ গুঁজেছে।
অনিলাভর সেটা চোখ এড়াল না, তিনি প্রসঙ্গ পালটাতে বললেন, “আসলে সব কথা তো মানতে পারিনি। আর ওর কোনোদিনই বেশি কিছু চাহিদা ছিল না। তাই নিজে থেকে যখন বলেছিল সেটুকু পালন করা আর কী।”
“মা আপনাকে নিজে থেকে বলেছিলেন? আর আপনি সেটা এখনও মানছেন?”
অনিলাভ দেখলেন ছেলে মোবাইলে ব্যস্ত আর নাতনি মোম পেন্সিল দিয়ে ড্রয়িং খাতায় আঁকিবুকি কাটছে। তার মানে তার আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
“আসলে নূপুর চিরদিনই সমুদ্র ভালবাসত। ওর সাথে প্রথম যেদিন দেখা, সেদিনই একথা আমাকে বলেছিল।”
(৫)
চল্লিশ বছর! নূপুর থাকলে চল্লিশ বছর হত তাঁদের বিয়ের। ওর চলে যাওয়ার পরে, ছেলে অর্ক তাঁকে একখানা কুকুর দিয়েছে, একাকীত্ব কাটাতে। নূপুর পছন্দ করত না এসব পোষা, বলতো “বড্ড মায়া পড়ে যায়। ”
নূপুরের কোনো দাবী ছিল না। দীঘা, পুরী, বকখালি – সমুদ্র হলেই হল। অনিলাভ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তাই করতেন। এবার যাবেন তালসারি, মনে হয় বছর আটেক আগে শেষবার এসেছিলেন।
এ কথা সে কথায় তাদের ট্রেন দীঘায় ঢুকল। পরের গন্তব্য তালসারি। অর্ক নাকি কাছাকছি কোন একটা হোটেল বুক করে রেখেছে।
(৬)
অনিলাভর কোনোদিনই দুপুরে ঘুমোনোর অভ্যেস নেই; দুপুরের দিকে খাওয়াদাওয়া করে অর্করা রুমে চলে গেলে, তিনি সকালের খবরের কাগজটা একটু উলটেপালটে দেখতে লাগলেন।
ঘন্টাদুয়েক বাদে যখন দেখলেন রোদটা মরে এসেছে তিনি ঠিক করলেন হাঁটা দেবেন বীচের দিকটায়। একটু ফাঁকায় সময় কাটানো যাবে। পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়ে যখন হোটেলের দরজা দিয়ে বেরোচ্ছেন, দেখলেন দেবযানী ওদের ঘরের ব্যাল্কনিতে বসে। বড় মায়া জড়ানো মুখ।
(৭)
“প্রমিস? কথা দিচ্ছ? কোনো বাহানা চলবে না কিন্তু!”
“একদম, সত্যি সত্যি সত্যি।”
নূপুরের সমুদ্র ভাল লাগত বলে প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে অনিলাভ বউকে নিয়ে কন্যাকুমারী গেছিলেন। তখনই নূপুরের এই প্রমিস করানো, ওকে যেন প্রতি অ্যানিভার্সারিতে অনিলাভ সমুদ্রের জায়গাতেই নিয়ে আসেন।
“বাবু একটা ডাব দেবো নাকি?” অনিলাভর ভাবনা ভাঙে, “হ্যাঁ দাও দেখি, শাঁসওয়ালা,” নূপুরের খুব প্রিয় ছিল। অদ্ভুত সব খেয়াল, ও নাকি পরজন্মে সমুদ্রপাড়ের গাছ হবে আর হাঁ করে সারাদিন সমুদ্র দেখবে। অনিলাভ ভারী মজা পেতেন এসব শুনে।
হঠাৎ আনমনেই তাকালেন পিছনের ঝাউবনের দিকে। সূর্যের শেষ আলো গায়ে লেগেছে গাছগুলোর। যেন সত্যি সত্যি অনেকগুলো মানুষ সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর সমুদ্রের হাওয়া খাচ্ছে। অনিলাভর মনে হয়, আচ্ছা সত্যি যদি মৃত্যুর পরে মানুষ এরকম গাছ হয়ে যায়!
“এই যে, দিব্যি তো এই বুড়োটাকে ছেড়ে ঝাউ গাছ হয়েছে। আমাকে দেখতে পাচ্ছ তুমি? কথা রেখেছি কিন্তু, রাখবও – কিন্তু আমারও প্রাইজ চাই, তোমার পাশের স্পটটা আমায় দিতে হবে।”
ফোন বেজে ওঠে – অর্কর ফোন। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। ওরা মনে হয় চিন্তা করছে।
অনিলাভ হাঁটা দিলেন হোটেলের দিকে। রাস্তার আলোগুলো পথ করে দেয় অনিলাভকে। আবার আসবেন তিনি, হয়ত এইখানে কিংবা আর কোনো সমুদ্রতীরে। তাঁকে যে কথা রাখতে হবে।




এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান