লিখেছেন কৌস্তভ ভট্টাচার্য
পূর্বদিকের জানলা দিয়ে রোদ এসে পড়েছিল মেঝেতে। সাদা মার্বেলের ওপর ধুলোগুলো বিভিন্ন জ্যামিতি তৈরি করছিল। এইসময় রোজই করে। কাজের মেয়েটা রোজ নিয়মমাফিক ঝাঁটা বুলোয়। নিস্তরঙ্গ এই ঘরটায় একটা প্রাণের তরঙ্গ লাগে। ঝাঁটার দ্রুত সঞ্চালনায় ধুলোগুলো চলতে চলতে পৌঁছে যায় নিজের গন্তব্যে, ডাস্টপ্যানে। তীব্র নীল রঙের ডাস্টপ্যানটা। সকালের নতুন রোদে ঝলমল করে। কিছুক্ষণ টানা তাকিয়ে থাকলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়।
ঝাঁট দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায় মেয়েটা। মেয়েটার নাম রত্না। বয়েস পঁচিশ ছাব্বিশ হবে। দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা সেটাকে আরেকটু বাড়িয়ে দেখায়। ভরা যৌবনেই তাই রত্না কিছুটা মধ্যবয়স্কা। দু’ দু’টো বাচ্চা আছে। তাই পেটে চর্বি, বুকও ঝুলে গেছে খানিকটা। মুখের লাবণ্যও ফিকে।
পাঁচ বাড়ির কাজ করে রত্না। সকালে ঝাঁট দিয়ে, রান্না করে চলে যায়। ঘর মোছার সময় পায় না। দুপুরে আরেকবার আসে। এই সময়টুকুই এ ঘরে নারীর যত্নের স্পর্শ পড়ে। বাকি সময়টুকু তো শুধু রোগ আর রুগীর সহবাস। কঠিন অসুখ আর ওষুধের ঘরকন্না।
সল্টলেকের এই দোতলা বাড়িটা বাবাই বানিয়েছিলেন। তখন সরকার থেকে সল্টলেকে সস্তায় জমি দেওয়া হচ্ছিল। বাবার মতো অনেকেই জমি কিনে নিজের বাড়ি বানিয়েছিলেন। জায়গাটা তখন ধু ধু ফাঁকা। দোর্দণ্ডপ্রতাপ আইটি সেক্টর তখন দূর অস্ত। চব্বিশ ঘণ্টার পাবলিক ট্রান্সপোর্টও তখন ভবিষ্যতের গর্ভে।
তাই বাড়ি তৈরির প্রায় পর পরই গাড়ি এল গ্যারাজে। অ্যাম্বাসেডর। ঘন কালো রঙ। রবিবার দুপুরে বাবা নিজে পরিষ্কার করতেন। তন্ময় সঙ্গ দিত। সাবান দিয়ে, জল দিয়ে ধোয়ার পর গর্বিত মহিষীর মতো চকচক করত গাড়িটা। দুপুরের চড়া রোদে এতক্ষণ কাজ করে বাবার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে যেত। সেই ঘর্মাক্ত মুখের মধ্যেই একটা প্রচ্ছন্ন সন্তুষ্টি, একটা আনন্দ দেখতে পেত তন্ময়। ভবানীপুরের একান্নবর্তী ক্ষয়িষ্ণু পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে এসে, একদম শূন্য থেকে শুরু করে, নিজের পরিবারকে একটা সচ্ছ্বল জীবন দেওয়ার গৃহস্থ আনন্দ।
ভারতবর্ষ তথ্যপ্রযুক্তির মুক্তাঞ্চল হয়ে ওঠার আগের যুগের কম্পিউটার এঞ্জিনিয়ার বাবা। স্বভাবতই তৎকালীন নবাগত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলোর কাছে তার বাজারমূল্য চড়া। কিন্তু নব্বইয়ের শুরুর দিকের পশ্চিমবঙ্গে তখনো সরকারী নীতি কম্পিউটারের প্রতি বিরূপ। সেটাই বাবাকে আটকাচ্ছিল। আর তন্ময়ের পড়াশুনোর মাঝখানে বাঙলা ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল না তাঁর।
নতুন সহস্রাব্দে সেই বাধাও কেটে গেল। সল্টলেক সেক্টর ফাইভ নামক একদা অখ্যাত একটা অঞ্চল নিমেষে ভরে গেল, বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাদের বহুতল অফিস বিল্ডিংয়ে। সেরকমই একটা অফিসের উঁচুতলায় চাকরির শেষজীবনটা কাটাচ্ছিলেন বাবা।
পুরনো সবকিছুই পালটে যাচ্ছিল। গড়িয়াহাট, হাতিবাগান ছেড়ে সল্টলেক সিটি সেন্টারে পুজোর বাজার করতে যাচ্ছিলেন মা এবং তাঁরই মত আরো অনেকে। সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হলের লম্বা রডে ঝোলানো পাখার একটানা আওয়াজ আর পছন্দ হচ্ছিল না। তার বদলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টিপ্লেক্সে স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল।
তন্ময়দের মত আরো অনেক পরিবারই তখন দেশের সদ্য উদার অর্থনীতির খোলা হাওয়ায় ফুলে ফেঁপে ওঠা বাজারের ক্রেতা। তাদের কাছে ঘুরতে বেরনো, বেড়াতে যাওয়া, বাইরে খেতে খাওয়া – ইত্যাদির পরিভাষা বদলে যাচ্ছিল দ্রুত। নতুন কলকাতা তথা নতুন ভারতবর্ষের এই নতুন মানুষদের কাছে, নিছক আনন্দের জায়গা কেড়ে নিচ্ছিল কর্পোরেটে পালিশ করে গড়ে তোলা একটা চিরচেনা কিন্তু নতুন শব্দ – “এক্সপিরিয়েন্স”।
তন্ময়দের এই দ্রুত বদলে যাওয়ার সাথে আর তাল মেলাতে পাচ্ছিল না বুড়ো কালো অ্যাম্বাসেডরটা। প্রায় জলের দরে হস্তান্তর হল তার। গ্যারেজে তার জায়গা নিল নামী বিদেশী ব্র্যান্ডের সীডান।
নামজাদা স্কুলের চৌকাঠ পেরিয়ে ইতিমধ্যে নামজাদা কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনো করছে তন্ময়। স্নাতক হলেই দেশের রাজধানীতে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন তখন তার চোখেমুখে।
মেধাবী সেই উজ্জ্বল চোখের টানেই শাল্মলী কাছে এসেছিল বোধহয়। অন্তত সেটা ভেবেই ভাল লাগত তন্ময়ের। সিনেমা বলতে তখনো পর্যন্ত পপুলার হিন্দি ছবিই দেখত তন্ময়। বিশেষত শাহরুখ খানের ছবি। ঘরের দেওয়ালে বড় করে টাঙিয়ে রেখেছিল উসকোখুসকো চুল আর দু’গালের টোল সমেত শাহরুখ খানের পোস্টার। কেবল টিভিতে ‘কাল হো না হো’ অথবা ‘স্বদেশ’ সম্প্রচার হলেই রাত জাগত তন্ময়। মোবাইলের কলার টিউনেও তখন ‘চক দে ইন্ডিয়া’। এমনকি শাহরুখ খানের অ্যাওয়ার্ড শো হোস্টিংও সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখত।
শাল্মলী প্রথমে তন্ময়ের এই শাহরুখ প্রীতিতে হাসত। তারপরে বিরক্ত হত। সে সাহিত্যের ছাত্রী আর বিশ্ব সিনেমা বুভুক্ষু। শাহরুখের অধিকাংশ ছবি তার ছেলেভুলানো রূপকথা মনে হতো। শাল্মলীর ভাষায় একমাত্র ‘কভি হাঁ, কভি না’ সে সবটুকু বসে দেখেছে। তন্ময় শুনে আমতা আমতা করে বলেছিল – “ওটা তো ৯৪-এর ছবি। আমাদের তখন পাঁচ বছর বয়েস। ওই সময় তুই একটা গোটা সিনেমা বসে দেখতিস?”
শাল্মলীর মুখটা দেখে আর আলোচনাটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাহস পায়নি তন্ময়।
শাল্মলীই উঠে পড়ে লাগল তন্ময়ের সিনেমা দেখার চোখ তৈরি করতে। আইজেনস্টাইন থেকে লার্স ভন ট্রায়ার, হিচকক থেকে নোলান, বিমল রায় থেকে অনুরাগ কাশ্যপ, বার্গম্যান থেকে রিচার্ড লিঙ্কলেটার সবাই একে একে তন্ময়ের জীবনে এলেন। প্রথমদিকে অনেক ছবিই বুঝতে পারত না তন্ময়। ভাল লাগত না। শাল্মলী সময় নিয়ে ধরে ধরে বোঝাত।
তারপর একদিন বার্গম্যানের ‘সীনস ফ্রম আ ম্যারেজ’ দেখছিল দু’জনে। শাল্মলীর ল্যাপটপে। ওদের বাগবাজারের বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে বসে। ছবিটা শেষ হবার পর তন্ময় শাল্মলীর দিকে তাকিয়ে দেখল সে হাপুস নয়নে কাঁদছে। তন্ময় বুঝতে পারল শাল্মলী অনেকক্ষণই কাঁদছে, তন্ময় টের পায়নি। ছবিটায় বুঁদ হয়ে ছিল। আরো কিছুক্ষণ পর টের পেল, তারও দুটো গাল ভিজিয়ে দিয়ে চোখ থেকে গড়িয়ে নামছে, গরম নোনতা চোখের জল।
শাল্মলীই কাছে টেনে নিল তন্ময়কে। চোখের জল আশ্রয় পেল চুম্বনে। আদরে মাখামাখি হয়ে উঠল বিকেলের চিলেকোঠা। সেদিন বাড়ি ফিরে দেওয়াল থেকে শাহরুখের পোস্টারটা খুলে ফেলেছিল তন্ময়।
২০১০। তন্ময়ের লাস্ট ইয়ারের পরীক্ষা চলছে। পশ্চিমবঙ্গের হাওয়ায় তখন রাজনৈতিক অশান্তি। পরীক্ষা নির্ধারিত দিনক্ষণের থেকে দেরী করে হচ্ছিল। তনুমাসির ছেলের বিয়ে ছিল মুম্বাইতে। তন্ময় যেতে পারেনি। বাবা মা যাবেন ঠিক ছিল। ফ্লাইটের টিকিটের দাম বেশি পড়ছিল। বাবা মা ট্রেনেই যাবেন ঠিক করেছিলেন।
তন্ময়ের রাত জেগে পড়া অভ্যাস ছিল। সে জেগেই ছিল, যখন ফোনটা আসে। ফোনটা রেখেই রাজর্ষিদাকে ফোন করে। রাজর্ষিদা তন্ময়ের খুড়তুতো দাদা, তখন দিল্লীতে একটা নিউজ চ্যানেলের জুনিয়র রিপোর্টার।
– “হ্যালো রাজর্ষিদা। সরি এত রাতে ডিস্টার্ব করলাম। ঘুমচ্ছিলে? আসলে একটা ফোন এসেছিল…”
রাজর্ষি জানত তন্ময়ের বাবা মা জ্ঞানেশ্বরীতেই মুম্বাই যাচ্ছেন। এতক্ষণ খারাপ খবর না আসার প্রার্থনাই করছিল সে মনে মনে। তন্ময়ের ফোন দেখেই বুঝল প্রার্থনা বিফলে গেছে।
কঠিন কাজটা রাজর্ষিই করল। আস্তে আস্তে গোটা খবরটা খোলসা করল তন্ময়ের কাছে।
বাবার অফিস থেকে অনেকটাই সাহায্য করেছিল। টাকা পয়সা ইত্যাদি পেতে কোনো অসুবিধে হয়নি তন্ময়ের। শাল্মলীও শক্ত করে হাতটা ধরে রেখেছিল সেই সময়।
সেইসব পাট চুকে যাওয়ার পরেই অনাথ হওয়াটা পেয়ে বসল তন্ময়কে। সারাদিন দু’চোখে মলিন বিকেলের বিষণ্ণতা নিয়ে বেঁচে থাকতে শুরু করল সে।
গ্র্যাজুয়েশনের রেজাল্ট ভালই হয়েছিল। কিন্তু স্নাতকোত্তর প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলোয় পর পর অনুত্তীর্ণ হতে থাকল। পড়াশুনা ছেড়েই দেবে ঠিক করেছিল। শাল্মলী প্রায় জোর করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম লেখাল তার।
রাজধানী যাওয়া হল না তন্ময়ের। কলকাতার হাতটাও আলগা হয়ে গেল তার কাছে।
দিনের পর দিন ক্লাসে যেত না। শাল্মলী তাকে জিজ্ঞেস করত ক্লাসে না গিয়ে সে করে কী? একই উত্তর পেত – “বাড়িতে বসে সিনেমা দেখি।”
বস্তুত তাই করত সারাদিন। একের পর এক দুর্বোধ্য দুষ্প্রাপ্য বিদেশী ছবি দেখে যেত। সারাদিন। দিনের পর দিন।
শাল্মলী তাতেও সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করল কিছুদিন। যদি একাকীত্বটা কাটে। বারবার বলত তন্ময়কে থেরাপিস্টের কাছে যেতে। তন্ময় রাজি হয়নি – অদ্ভুত হাসত, শাল্মলী তাকে ডিপ্রেসড বললে। শাল্মলী তাও বলত, চেষ্টা করে যেত।
কিন্তু যে মানুষ একা হতে চায়, তার একা হওয়াটাই নিয়তি।
রাজধানী যেতে পারেনি তন্ময়, শাল্মলী পারল। ডক্টরেট করতে চলে গেল দিল্লীতে। যাওয়ার আগে একটা চিঠিতেই যা বলার বলে গেছিল –
“ভালবাসা আসলে একটা প্রতিশ্রুতি, তন্ময়। যেটা দুজন মানুষ পরস্পরকে করে। আমাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা হচ্ছে – তুই নিজের মানুষের জীবনটাকেই অস্বীকার করে যাচ্ছিস, দৈনিক। আমার কাছে সিনেমা অমৃতের মতো ছিল। সেই অমৃত ভর্তি গ্লাসে চুমুক দিতে বলেছিলাম তোকে। বুঝিনি, যে সেটা তোর কাছে নার্কোটিক হয়ে দাঁড়াবে। তুই স্বেচ্ছায় মানুষ থেকে জড় পদার্থ হয়ে বাঁচতে চাস। জড় পদার্থের কাছে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায় না। আমিও দেব না আর।
আর কথা হবে না আমাদের।
ভাল থাকার চেষ্টা করে দেখতে পারিস।”
সেটা ২০১৩। গত দশ বছরে আর যোগাযোগ হয়নি শাল্মলীর সাথে।
দুপুর হয়ে গেছে। দুপুরের খাওয়া শেষ করে একটা সিনেমা দেখছিল তন্ময় বসে বসে। আগে টরেন্ট থেকে ডাউনলোড করত। এখন ওটিটিতেই দেখে।
রত্না ঘর মোছার বালতি নিয়ে ঢুকল। তন্ময় চেয়ারে বসে মাটিতে পা ঝুলিয়ে সিনেমা দেখছিল। ঘর মুছতে মুছতে তন্ময়কে পা সরাতে বলল রত্না। তখনই খেয়াল করল তন্ময় অন্যদিনের তুলনায় রত্না আজ একটু বেশিই সেজে এসেছে। উগ্র সাজ নয়, সুন্দর সাজ। ভাল মানিয়েছে তাকে।
তন্ময় বোধহয় একটু বেশিক্ষণ ধরেই তাকিয়েছিল রত্নার দিকে। রত্না লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি ঘরটা মুছে চলে গেল সেখান থেকে।
গোটা ব্যাপারটা একটু অপ্রস্তুত করে দিল তন্ময়ের দুপুরবেলাটাকে।
“মেয়েটা সেজেছিল কেন?” – ভাবল তন্ময়। তারপর ল্যাপটপে চোখ পড়তে তারিখটা দেখল। ছাব্বিশে জানুয়ারি। কোথাও বেড়াতে টেড়াতে যাবে বোধহয় বিকেলের দিকে। আজকে সব জায়গায় খুব ভিড় করে লোকজন। শাল্মলী আর তন্ময়ও বেরিয়েছিল দু’একবার ছাব্বিশে জানুয়ারি। ভিড় ঠেলার বীভৎস অভিজ্ঞতা।
দুর্বল লাগছিল। সিনেমাটা বন্ধ করে একটু ঘুমোবে ঠিক করল তন্ময়।
একবছর ড্রপ দিয়ে পরের বছর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত সাধারণ রেজাল্ট নিয়ে মাস্টার্স শেষ করে তন্ময়। তারপর পড়াশুনো করার স্পৃহা আর বিশেষ ছিল না তার।
আসলে কিছুই করার স্পৃহা ছিল না।
কিন্তু এতদিন ধরে এত সিনেমা দেখায় একটা সিনেমাবোধ তৈরি হয়ে গেছিল।
ততদিনে রাজর্ষিদার মিডিয়াতে বছর চারেক চাকরি হয়ে গেছে। চেনাজানাও হয়েছে খানিক। একটা ছোট অনলাইন নিউজ পোর্টালে ফিল্ম রিভিউয়ারের কাজ জুটিয়ে দিল, একরকম জোর করেই।
প্রথম কিছুদিন খারাপ লাগেনি। বছর কয়েক যাওয়ার পর, দিনের পর দিন বস্তাপচা ছবি দেখে একইরকম গতে বাঁধা রিভিউ লিখে যেতে আর ভাল লাগছিল না তার। কাজটা ছাড়তে চাইছিল। কিন্তু পোর্টালের মালিক রাজর্ষিদাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। তন্ময়ের কাজও পছন্দ ছিল তাঁর। আর রাজর্ষিদা তন্ময়ের একাকীত্ব পালনের কথা জানিয়ে রেখেছিল ভদ্রলোককে। তাই কোনোভাবেই তন্ময়কে ছাড়তে চাননি তিনি। কাজের চাপ বরং কমিয়ে দিয়েছিলেন খানিক।
বাড়ি থেকেই বেশিরভাগ দিন কাজ করতো তন্ময়। মাঝেমাঝে জরুরি কাজে অফিস যেতে হত।
২০১৮-এর গ্রীষ্মে একদিন অফিসে ঢুকেই চোখে অন্ধকার দেখে অজ্ঞান হয়ে যায় সে।
ডাক্তারসহ সকলে প্রথমে ভেবেছিল প্রবল গরমে হিটস্ট্রোক হয়েছে। হাসপাতালে পরীক্ষা করে জানা গেল তা নয়। শাল্মলী ছেড়ে যাওয়ার অথবা অনাথ হওয়ার অনেক আগে থেকেই তন্ময়ের হৃদয়, আক্ষরিক অর্থেই আহত। তার হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত। হৃদপিণ্ডের পেশি শক্ত হয়ে রক্ত সঞ্চালনের জন্মগত সমস্যা, অনেকের ক্ষেত্রেই সাবালক হওয়ার পর ধরা পড়ে। পোশাকি নাম হাইপারট্রফিক কার্ডিও মায়োপ্যাথি।
তন্ময়কে অফিস ছাড়তে চায়নি, বাধ্য হল। ডাক্তার বছরখানেকের জন্য ঘরবন্দী করেছিলেন তাকে। তারপর থেকে তন্ময়ই স্বেচ্ছা ঘরবন্দী।
রাজর্ষিদা ততদিনে মিডিয়ার কেষ্টবিষ্টু রীতিমত। তাদের মিডিয়া হাউস তখন সদ্য বাঙলা ভাষায় যে চ্যানেলটি খুলেছিল, তার অন্যতম মুখ হয়ে গেছে সে। কলকাতায় ফিরে এসেছে। পাশের ব্লকেই থাকে।
সেই তন্ময়ের অলিখিত অভিভাবক। অভিভাবকের দায়িত্বটাও সামলাল।
বাড়ির একতলাটা একটা ভাড়ার ব্যবস্থা করে দিল। রত্না তাদের বাড়িতেই কাজ করত। তন্ময়ের কাছেও তাকে কাজে রেখে দিল। প্রথম একটা বছর একজন সারাক্ষণের অ্যাটেন্ডেন্টও ছিল। তারপর তন্ময়ই ছাড়িয়ে দিয়েছে তাকে।
দুপুরে ঘুমটা বেশি হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যে প্রায় সাতটা বাজিয়ে উঠল তন্ময়। চা বানিয়েই রেখে যায় রত্না। কাপে ঢেলে শুধু মাইক্রোওয়েভে গরম করে নেওয়া।
চা হাতে নিয়ে বসে ল্যাপটপ অন করল। ক্লাসিক দেখছিল আজকে। বার্গম্যানের ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ’। প্রফেসর আইজ্যাক বর্গের ড্রিম সিকোয়েন্সটা হচ্ছিল। যেখানে আইজ্যাক বর্গের শাস্তি ঘোষণা হয় – একাকীত্ব। আইজ্যাক বর্গ প্রশ্ন করেন – “ক্ষমা নেই? ক্ষমা নেই কোনো?”
“আপনি বাড়ির বাইরে একদমই বেরোন না, তাই না মিস্টার চৌধুরী?” – শেষবার ডাক্তার জিজ্ঞেস করেছিলেন তন্ময়কে।
তন্ময় হাসে উত্তরে।
“একটু বেরোন মাঝেমাঝে। ইট উইল ডু ইউ আ লট অফ গুড।”
“সুস্থ হয়ে যাব বলছেন?”
“শরীরের অসুখটাই কী সব মিস্টার চৌধুরী? মনটাও তো ভাল রাখা দরকার। দিনের পর দিন একা বাড়ি বসে থাকা ইজ নট আ ন্যাচারাল হিউম্যান বিহেভিয়ার। ইউ মাইট জাস্ট বি আ ক্লাসিক কেস অফ ক্লিনিকাল ডিপ্রেশন। হ্যাভ ইউ এভার সীন আ থেরাপিস্ট?”
স্বাভাবিক মানুষী ব্যবহার নয় তার। ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন, থেরাপিস্ট – তন্ময়ের চোখের সামনে বহুদিন পর শাল্মলী উঠে দাঁড়ালো যেন।
অস্বস্তি লাগল তন্ময়ের। প্রসঙ্গান্তরে যেতে চাইল।
“সম্পূর্ণ সুস্থ হবার উপায় নেই তাহলে?”
“ওষুধে যতটা করা যায় আমরা তো করে দিয়েছি। বীটা ব্লকার, ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার, ব্লাড থিনার সবই তো চলছে এতদিন ধরে। আপনার ক্ষেত্রে আনফরচুনেটলি মেডিকেশনে একটা পয়েন্টের পর সুস্থ করা সম্ভব নয়। একটা ওপেন হার্ট সার্জারি করা যায়। কিন্তু তাতে পাকাপাকিভাবে সুস্থ হবেন কিনা বলা যায় না। আর একটা উপায় তো আছে মিস্টার চৌধুরী। ইউ নো দ্যাট ভেরি ওয়েল। আপনি সুযোগ দিলেই আমরা চেষ্টা করতে পারি।”
“এদেশে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের পরে দশ বছরের সারভাইভাল রেট মাত্র ৫৬%, ডক্টর। মানে ৪৪% সম্ভাবনা আমি দশ বছরের মধ্যে ট্রান্সপ্লান্ট করেও মারা যেতে পারি। অর্থাৎ অলমোস্ট ৫০-৫০ চান্স। দিস ইজ অ্যাজ গুড অ্যাজ টসিং আ কয়েন।”
“৫৬% সম্ভাবনা মিস্টার চৌধুরী। একটা আস্ত, গোটা, জীবন দেখে নেওয়ার ৫৬% সম্ভাবনা। আর টসিং আ কয়েন বলছেন?
আমি নিজে গাড়ি চালাই। প্রত্যেকবার অ্যাক্সিলেটরে পা রাখলে জীবন আমাকে ওই ৫০-৬০% সম্ভাবনাই দেয়।”
তন্ময় কিছু না বলে বেরিয়ে আসছিল চেম্বার থেকে। ডাক্তার একটা প্রশ্ন করলেন –
“সুস্থ হবেন কিনা জিজ্ঞেস করছিলেন না? আমি বরং একটা প্রশ্ন করি। আপনি কি সুস্থ হতে চান?”
ল্যাপটপের সামনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল তন্ময়। ঘুম ভাঙল অসহ্য বুকে ব্যথা নিয়ে। গোটা শরীর ঘামে ভেজা। চোখে ঝাপসা দেখছিল তন্ময়।
উঠে বসার চেষ্টা করল। পারল না।
তার মোবাইলে একটা এসওএস অ্যাপ ইন্সটল করা আছে। রাজর্ষিদা পইপই করে বলে রেখেছে রাতবিরেতে কখনো বিপদে পড়লে সেখান থেকে এসওএস কল পাঠাতে সব এমার্জেন্সি কনট্যাক্টদের।
তন্ময় কোনরকমে ফোনটা হাতড়ে হাতড়ে অ্যাপটা খুলল। চোখে ঘন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে তখন। এসওএস লেখা বোতামটায় কোনরকমে আঙুল ঠেকিয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
ল্যাপটপটা বন্ধ হয়ে গেছে ততক্ষণে। ঘরে শুধু মোবাইলের হাল্কা নীলাভ আলো।
এরকমভাবেই মরে যাবে সে। অনেকবার ভেবেছে।
নীল আলোটাও নিভে গেল কয়েক সেকেন্ড পরে। তারপর তন্ময়ের আর কিছু মনে নেই।
প্রায় আট ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরল তার। আইসিইউতে।
রাজর্ষিদা দেখা করতে এল বিকেলে, ভিজিটিং আওয়ার্সে। তন্ময়ের মনে তখন অনেক প্রশ্ন।
রাজর্ষিদা আগেই আঁচ করেছিল। সবকটা উত্তরই দিল একে একে। রত্নাই প্রথম এসওএস কলটা লক্ষ্য করে। সে তখনো ঘুমোয়নি। প্রথমে রাজর্ষিদাকে ফোন করে। ফোনে না পেয়ে বরকে সঙ্গে নিয়ে রাজর্ষিদার বাড়ি আসে। তারপর রাজর্ষিদা, রত্না, রত্নার বর আর তন্ময়ের ভাড়াটে ছেলেটা মিলে তন্ময়কে উদ্ধার করে। রাজর্ষিদার কাছে তন্ময়ের মূল দরজার একটা চাবি থাকতই।
তারপর আর কী? ডাক্তারকে খবর দিয়ে সাথে সাথে হাসপাতাল।
রাজর্ষিদা চলে গেলে রত্না এল দেখতে। হাতে তার অল্প কয়েকটা ফলমূল। সিস্টার এসে নিয়ে গেল সেগুলো।
তন্ময় চুপ করে বসেছিল। রত্নাও কী বলবে বুঝতে পারছিলনা। তারপর নিজে থেকেই বলল
“এবার ভাল হয়ে বাড়ি চলুন দাদা।”
তন্ময় হাল্কা হাসল। তারপর হঠাৎ কী মনে হওয়ায় জিজ্ঞেস করল –
“সেদিন কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলে?”
রত্না লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল – “আপনার মনে আছে?”
তারপর নিজেই একটু থেমে বলল –
“শাহরুখের নতুন বই এসেছে। ওকে বললাম নিয়ে যেতে। চার বছর পর শাহরুখের বই…”
বলতে বলতে মুখ চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল রত্নার।
“শাহরুখের সিনেমা! চার বছর পর!”
মনে মনে ভাবল তন্ময়।
“ফিরতে রাত হয়ে গেল দাদা। তাই তো জেগে ছিলাম আপনার কল এল যখন। সিনেমা দেখে, একটু খেয়ে দেয়ে সবাই মিলে।
এই একটা দিনই তো ওর একটু ছুটি থাকে। ওই বলল চলো বাইরে খাই…”
ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হয়ে গিয়েছিল। রত্না চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এলেন।
“কেমন আছেন এখন?”
হাল্কা হেসে তন্ময় বলল – “একটু ভাল।”
“ক্লোজ শট। আ মিনিট হিয়ার অ্যান্ড দেয়ার ক্যুড হ্যাভ বিন ফেটাল।”
“আচ্ছা ডক্টর…”
“হ্যাঁ বলুন…”
“শাহরুখের নাকি নতুন সিনেমা এসেছে…”
“শাহরুখের…সিনেমা…ওহ ‘পাঠান?’ হ্যাঁ, আমার মেয়ে তো ফার্স্ট ডে-তে দেখেছে। ভাবতে পারেন? ষাট ছুঁই ছুঁই একটা লোক, ইন্ডিয়ান লোক, ফুল অন অ্যাকশন হিরো সাজছে প্রথমবার।”
তন্ময় যেন স্বগতভাবেই বলল – “আমি কলেজ লাইফ অবধি শাহরুখ খানের ফ্যান ছিলাম জানেন।”
“তাই? হ্যাঁ আপনি তো মুভি বাফ। আপনার দাদা বলেছিলেন।”
“ডক্টর…”
“ইয়েস?”
“আই অ্যাম রেডি ফর দ্যা ট্রান্সপ্লান্ট…”
“ব্রিলিয়ান্ট…”
“দাঁড়ান। তার আগে একটা শর্ত আছে…”
“শর্ত? আচ্ছা…বলুন।”
“আমায় একবার ‘পাঠান’ দেখাতে হবে। পারবেন?”




এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান