মড়ার জিনিস ছোঁয়া মানা

গল্পটি পাঠ করেছেন অঙ্কনা নায়ক

“এই সুন্দর লেপটা কোথায় পেলি রে?” 
রতন ফুটপাথে বস্তা পাততে পাততে তার ফুটপাথিয়া বন্ধু হারুকে বলল, “ওই তো গঙ্গার পারে।” 
“তুই আবার মড়ার ফেলে দেওয়া জিনিস কুড়িয়েছিস?” 
“এই ঠান্ডায় কষ্ট পাওয়ার থেকে মড়ার ফেলে দেওয়া এত সুন্দর লেপ গায়ে দেওয়া অনেক ভাল।” 
“কারা ফেলল রে?” 
“আরে এই এলাকার বস, যে কাল মরল। তাকে পোড়াতে এসেই তো এসব ফেলে দিল তার বাড়ির লোক। দ্যাখ, আমাদের হাড় মাংস চুষে ওরা কী দামী জিনিস ব্যবহার করে!” 
“তুই দেখ। ওই শয়তানের জিনিস আমি ছুঁয়েও দেখব না।” 
 
মাঝরাতে রতনের কীরকম যেন অস্বস্তি হতে লাগল। মনে হতে লাগল লেপটা যেন ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। এই ঠান্ডায় লেপটা যে ফেলে দেবে তাও পারল না। ভাবল বড়লোকের জিনিস গায়ে দেওয়ার অভ্যাস নেই, তাই এমন হচ্ছে। 
রতনের শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। ঘুসঘুসে জ্বর সাথে অস্বাভাবিক দূর্বলতা। হারু বলছিল ওকে নাকি ফ্যাকাসে দেখতে লাগছে৷ 
“এই রতন, হাসপাতালে গেছিলি?” 
“হ্যাঁ রে৷ ওষুধ দিয়েছে। টেস্টও দিয়েছে।” 
“করিয়ে নিস টেস্ট। তা ডাক্তার কী বলল দেখে?” 
হারুর প্রশ্নে রতন বলল, “আমায় ভাল করে খাওয়া দাওয়া করতে বলল। আমার নাকি রক্ত কমে যাচ্ছে।” 
“আমাদের মত ভিখারির আর ভাল খাওয়া!” দীর্ঘশ্বাস ফেলে হারু বলল। 
 
টেস্ট আর করানো হল না রতনের। ভোরবেলায় নিজের বিছানা গোছাতে গোছাতে রতনের দিকে তাকাতে হারুর কেমন সন্দেহ হল। কেমন এক দৃষ্টিতে চোখ বড় বড় করে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে রতন! 
“এই রতন, ওঠ। সকাল হয়ে গেছে।” গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতেই হারু বুঝে গেল সব শেষ। মৃত রতনের গায়ের লেপটার দিকে এবার নজর পড়ল তার। 
“কী সুন্দর মোটা লেপ! যখন প্রথম দেখেছিলাম তার থেকেও এখন বেশি সুন্দর লাগছে। রঙ যেন ফেটে বেরোচ্ছে।” 
মুগ্ধ হয়ে লেপের দিকে তাকিয়ে রইল হারু। লেপটা যেন তাকে ওর নিজের দিকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করছে। 
“হোক মড়ার। ঠান্ডায় তো বাঁচব।” কেউ দেখে ফেলার আগেই লেপটা রতনের গা থেকে খুলে নিল হারু। 
যথারীতি পুলিশ সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ করে রতনের বডিটা নিয়ে চলে গেল। 
রাতে লেপমুড়ি দিয়ে বেশ আরাম করেই হারু শুল। মাঝরাতে হারুর কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। মনে হল লেপটা যেন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। 
 
“দেশের হাল দেখ। খেতে পায় না। অথচ গায়ে দামী লেপ!” 
পুলিশ হারুর লাশ তুলতে তুলতে বলল। 
 
“মা, মা দেখো কী পেলাম?” 
“ওমা কী সুন্দর লেপ! কোথায় পেলি রে মান্তু?” 
“ওপাড়ার বড় ডাস্টবিনে পড়েছিল। এবার শীতে আমাদের আর কোনো কষ্ট হবে না মা।” 
 
মা মেয়ের খুশিতে আমিও খুশি হলাম। আর হব নাই বা কেন! এবার তো কচি রক্ত পান করব। মানুষ থাকাকালীন ওদের নিংড়ে নিজের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স করেছি। আর এখন ওদের রক্তচুষে নিজের তৃষ্ণা মেটাব। যত এরা লেপ গায় দেবে তত লেপের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমার তৃষ্ণা মিটবে। সাধে কি বলে, “মড়া মানুষের জিনিস ছোঁবে না।” 

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Blog at WordPress.com.

Up ↑