নন্দিনী অধিকারী
“সতরঙ্গী রে..” গানে শাহরুখ খান আর মনীষা কৈরালা কামনার সাত রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমি অবাক হয়ে ভাবছি এ কেমন ভয়ানক-সুন্দর পটভূমি! ‘দিল সে’তেই প্রথম লাদাখ দর্শন। খুব যে সেখানে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, এমনটা নয়। রুক্ষশুষ্ক মানুষ আর প্রকৃতি দুইই আমার বিশেষ সহ্য হয় না। একদিন মেয়ে আর তার শ্বশুরবাড়ি থেকে ডাক এল, “তুমিও চলো, আমরা লাদাখ যাচ্ছি।” আমিও সে ডাক আর ফেরাতে পারলাম না। দিল্লী থেকে লেহ্’র আকাশপথেই মুগ্ধতার শুরু। অসংখ্য হিমবাহ পাহাড়ের গা দিয়েগড়িয়ে পড়ছে দুধের ধারার মত। কোথাও যেন বরফের মাখন প্রলেপ। আকাশের রঙমাখা নীল পাহাড়ে বরফের পাউডার ছড়িয়ে আছে ইতস্তত। সেই কুষাণযুগ থেকেই লাদাখের কঠিন গিরিপথ ধরে বাণিজ্য সম্ভারের আদানপ্রদান চলেছে। কত নাম না জানা তীর্থযাত্রী ও পর্যটক যে পথ অতিক্রম করেছেন, সেখানে এখন ভারতের সীমান্তসেনাদের অতন্দ্র প্রহরা। তাঁদের বিজয় অভিযানের গৌরবগাথা নিয়ে লেহ্ শহরে আছে একটি ম্যুজিয়াম – নাম ‘হল অফ ফেম’। যে নদীর বহমানতায় যুগে যুগে কত ইতিহাস রচিত হয়েছে সেই নীলবরণ সিন্ধুনদ ঘিরে রয়েছে লেহ্ শহরকে। লাদাখি-রা নদী-নালার ধারে ধারে চাষ করেছে। লম্বা লম্বা পপলার, উইলো গাছ দিয়ে সবুজ করে তুলেছে শহরটাকে। সেইসব গাছের কাঠ তাদের ঘরবাড়ি বানানোর কাজে লাগে। এই সময় গাছের ফুলেরা তুলোর মত হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের রেণুতে কেউ কেউ হেঁচেকেশে একসা। গোটা লাদাখ জুড়ে অসংখ্য গুম্ফায় বিরাজিত রয়েছেন মৈত্রেয় বুদ্ধ। লেহ্’র শান্তিস্তূপে সোনারবরণ বুদ্ধ সূর্যালোকে ঝলমল করেন। ‘ওম্ মণিপদ্মে হুম্’ উচ্চারিত হয় বজ্রযানীদের প্রার্থনায়। পাহাড়ের পাথর এখানে কখনো রসগোল্লা-রাজভোগের মত গোল গোল। কোথাও কোথাও স্তরীভূত। কোনো কোনো জায়গায় এতটাই বিশাল এবং এলোমেলো যে মনে হয় একটু টোকা লাগলেই গড়িয়ে পড়ে আমাদের গাড়ি চুরমার করে দেবে! রুক্ষতার, ধূসরতার এত রঙ আমি আগে কখনো দেখিনি। এক একটি পাহাড় যেন মৌনী সাধক। অনন্তকাল ধরে কঠিন সাধনারত। অন্যদিকে গোটা লাদাখ জুড়ে বয়ে চলা সিন্ধু, শ্যায়ক, জাংস্কার নদীরা কখনো আকাশের থেকেও নীল। সেই সুন্দরী নদীর পাশে দু’দন্ড বসে আলাপ করতে ইচ্ছে করে। পাহাড় থেকে বয়ে আনা বালি, পাথর, কাদা নিয়ে সেই নদীরাই আবার গৈরিকবসনা-ভয়ঙ্করী। পাথরে ধাক্কা লেগে তার উদ্দাম স্রোত। নিম্মুগ্রামে সিন্ধু আর জাংস্কারের সঙ্গমস্থল দেখে মনে হয় সন্ন্যাসীর ধ্যানভঙ্গ করতে এসেছে নীলবসনা ঊর্বশী।
নদীর পাশে থাকা লাদাখের রাজধানী লেহ্ শহরটা গড়ে উঠেছে আধুনিকতা আর প্রাচীন ঐতিহ্যের হাত ধরে। তার বাজারের ছবিটা যে কোনো সুন্দর পার্বত্যশহরের মতই। পাথরের গয়না, ফেং-শুই বস্তু, শাল-সোয়েটার কিনে-টিনে সুন্দর সাজানো ক্যাফেতে বসে গরম কফি, মাখন-নুন চা, থুকপা, মোমো, চাউমিনের স্বাদ নেওয়া যায়। আমাদের এগারোজনের দলে অনেকেই বেশ খাদ্যরসিক ছিলেন। তাঁদেরই খোঁজাখুঁজির ফলে খাওয়া হল চিকেন টিংমো, সঙ্গে শাপ্তা, চিকেন লাফ্ফা (এটি সম্ভবতঃ ইজরায়েল থেকে আগত), ও চিকেন কোথে। চিকেন টিংমোতে মোমোর ভিতরের মালমশলা আছে। তাই এই নামটুকু নেওয়া হয়েছে। শাপ্তা বেশ দেখতে। জিলিপির আকার। বিনা মিষ্টির বানরুটির মত খেতে। চিকেন কোথে মোমোরই প্রকারভেদ, একদিক সেঁকে নেওয়া। চিকেন লাফ্ফা একটি মোটাসোটা রোল, ভেতরে শাকপাতা-সব্জি-চিকেনের টুকরো-নানারকম হার্বস-হামাস। আমার আকর্ষণ ছিল অন্যত্র। স্থানীয় লাদাখি মহিলারা পথে বসে বিক্রি করছিলেন পাকা অ্যাপ্রিকট, তাজা মটর, বীনস ও বোকচয়ে। সুন্দরী সব্জীওয়ালী শিরিং দ্রোলমার মাথায় ফুলের টুপি। কানের দুলের সঙ্গেই একত্রে লাগানো গলায় রঙবেরঙের পুঁতির মালা। চুলে গুচ্ছ গুচ্ছ বিনুনি। আরেকজনের কেশসজ্জা তো দেখার মত। তিনি সানগ্লাস চোখে সব্জি বেচেন। বিড়ি ফোঁকেন। আবার টিভিতে গানও করেন। বেশ আকর্ষণীয় চরিত্র। ফোটো তুলব বলতেই পোজ দিলেন। ঠাট্টা করে বললেন, ফোটো তোলার জন্যে একশ টাকা দিতে হবে। এঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলেন তিব্বতী ভাষায়। যদিও হিন্দিটাও ভালই বোঝেন এবং বলতেও পারেন। এই ঊষর ভূমিতে বৃষ্টি পড়লে লাদাখিরা ভয় পায়, এই বুঝি হড়কা বানে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সব! জুনের শেষ আর জুলাইয়ে লাদাখের তাপমাত্রা থাকে ঊনিশ থেকে একুশ ডিগ্রী। কিন্তু খারদুংলা পাস আর প্যাংগং লেক ছাড়া সর্বত্র গরম। আমাদের বস্তাভরা গরম জামাকাপড় প্রায় কিছুই কাজে লাগেনি। আমাদের পরের গন্তব্য নুব্রা ভ্যালি। বরফের মরুভূমি। যদিও এখন সেখানের বরফের বদলে সাদা বালি। সেখানে হাওয়ারা আলপনা এঁকে যায়। ছোট ছোট বালির টিলা তৈরি করে। দু’কুঁজওয়ালা শান্ত ব্যাকট্রিয়ন উট মুখটি তুলে সওয়ারী করে। তার হেলেদুলে চলার সঙ্গে গলার ঘন্টা টুংটাং বাজে। ইচ্ছে হলে তার পিঠে বসা যাত্রীর জামায় একটু মাথা চুলকে নেয়! পথের ধারে মাঝেমাঝে দেখা যায় বরফের প্রলেপ। হঠাৎ আবার দেখা যায় সবুজ ঘাসের জমিতে বরফের পুকুর হয়ে আছে। যাত্রীদের আর থামানো যায় না তখন। প্রত্যেকের অন্তরের শিশুমন চঞ্চল হয়ে ওঠে। রাস্তায় আরো চোখে পড়ে ভেড়ার পাল নিয়ে চলেছে লাদাখি বালিকা। বুনো ঘোড়ারা ঘাস খাচ্ছে তৃণভূমিতে। পাথরে ফুটে উঠেছে পাহাড়ি গোলাপ। মারমট নামে কাঠবেড়ালির মত মিষ্টি দেখতে ছোট্ট প্রাণীরা দিব্যি মানুষের কাছাকাছি আসছে। নিজের গর্তে ঢুকছে আবার বন্ধুর সঙ্গে গলাগলি করছে। লম্বা ল্যাজ নিয়ে লাদাখি দোয়েল গাছের ডালে ডালে নেচে বেড়াচ্ছে। এসব দেখতে দেখতেই আমরা পৌঁছে গেলাম তুরতুক গ্রামে।
লেহ্ থেকে অনেকটা দূরে রুক্ষ পাহাড়, ঊষর মরুপথ পার করে এখানে একটু চোখের আরাম। ভয়ঙ্কর শীত পেরিয়ে এখন চাষের খেত সবুজ। আঙুরলতা লতিয়ে আছে মাচায়। টুনি বালবের মত কমলা রঙের অ্যাপ্রিকট গাছে গাছে জ্বলজ্বল করে ঝুলছে। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের এই গ্রামে দেশভাগের রেখা রাতারাতি টানা হয়েছিল। মাঝরাতে ভাই তার বোনের থেকে বিচ্ছিন্ন হল। প্রতিবেশী হারাল তার স্বজনবন্ধুকে। বাস্তুভিটের মায়া ত্যাগ করতে হল শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষকে। এমনি মর্মস্পর্শী গল্প শোনাচ্ছিল লাদাখের তুরতুক গ্রামের আব্দুল। উচ্ছ্বল, খরস্রোতা শ্যায়ক নদীর তীরে তার ছোট্ট রেস্তোরাঁ। তুরতুকে সীমান্তসেনাদের অতন্দ্র প্রহরা। এমনিতে আব্দুলরা তাদের তত্ত্বাবধানে ভালই আছে। তবু দেশভাগের দুঃখ কোথাও যেন ঐ শ্যায়ক নদীর স্রোতের মতই তারা বয়ে বেড়ায়। পাকিস্তান আর ভারতের এই অঞ্চলটি একসঙ্গে গিলগিট বালটিস্তান বলে পরিচিত। এখানকার সুন্দর মানুষগুলো নিজেদের বালটি বলে পরিচয় দেয়। স্থানীয় খাবার চাইতে আব্দুল আমাদের খাওয়াল কেশীর-শামিক আর ফাডিং বালে। অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে খদ্দের সামলাতে সামলাতে সে আমাদের কৌতূহল মেটাচ্ছিল। কেশীর একরকমের প্যানকেক। তৈরী হয় বাকহুইট নামে শস্যের আটা দিয়ে। সামান্য একটু বেকিং পাউডার আর নুন তার উপকরণ। বাকহুইট একমাত্র বালটিস্তানের জমিতেই জন্মায়। অক্টোবরে সেই ফসল কাটা হয়। কেশীরের সঙ্গে ডীপ হিসেবে দেওয়া হয় টক দইয়ের সঙ্গে শামিক। শামিক একরকমের হার্ব। এই অঞ্চলেই চাষ করা শামিকের সবুজ পাতা বালটি মানুষরা রোদে শুকিয়ে রাখে শীতে ব্যবহারের জন্যে। ফাডিং বালে ওখানকার মানুষদের সুইট ডিশ। তাজা অ্যাপ্রিকট দিয়ে তৈরি। এর আগে এক অভিজাত হোটেলে অ্যাপ্রিকটের হালুয়া খেয়ে মুগ্ধ হয়ে ছিলাম। এদের গরম জলে ফোটানো অ্যাপ্রিকট বা ফাডিং বালে দেখতে অনেকটা গরম রসে ডোবানো গুলাবজামুনের মত। কিন্তু এতে একেবারেই চিনি দেওয়া হয় না। আমি এটিতে যেন চাটনির স্বাদ পেলাম। অত্যন্ত সাধারণ উপকরণ দিয়ে তৈরি সাধারণ এই পদগুলি হয়ত আর কোনদিন চেখে দেখার সুযোগ হবে না। তবে তুরতুক গ্রামের আব্দুল রয়ে যাবে আমাদের স্মৃতিতে তার স্বজন হারানোর গল্প নিয়ে। দুঃখ একটাই, সুপুরুষ আব্দুলের কোনো ছবি তাড়াহুড়োতে আর নেওয়া হল না। তার ছোট্ট, সুদৃশ্য হোটেলের ছবি কেবল রয়ে গেল আমাদের মনের ফোটো গ্যালারিতে। এরপরে আমাদের শেষ চমক অপেক্ষা করছিল প্যাংগঙ লেকে। ঘন্টায় ঘন্টায় সে জলরাশি সাজ বদলায়। নীল আর সবুজই তার সবথেকে পছন্দের রঙ। কোনো রঙের কোম্পানীর শেডকার্ডের সাধ্য কী এই নীলসবুজের সমস্ত আভাকে ধরে রাখে? সকাল বিকেল সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের লাল রঙকেও বুকে ধরে নেয় প্যাংগঙ। সেও এক অদ্ভুত মিক্সম্যাচ হয়ে যায়। অত উচ্চতায়, অমন রঙের খেলা দেখে প্রাণপাখিরও বোধহয় উড়ে যেতে মন চায়। আমাদের দলের অনেকেরই সেখানে নিঃশ্বাসের কষ্ট হয়েছে। তবে সঙ্গে ওষুধপত্র থাকায় বাড়াবাড়ি কিছু হতে পারেনি। লাদাখ এমনই ভয়ঙ্কর-সুন্দর। পথের প্রতিটি বাঁকে সে দৃশ্যপট পরিবর্তন করে। সে স্বর্গীয় ছবি একজীবনে সবটা দেখা হয়ে ওঠে না। কত কিছু অধরা রয়ে যায়। সেই অনাবিল-অকৃত্রিম সৌন্দর্যের ছোঁওয়াটুকু নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ ‘জুলে লাদাখ’ বলে তাকে বিদায় জানিয়ে ঘরের পথ ধরি।




এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান