গুড় -পাটালি

সাঁওতাল পরগণার যে গ্রামটির কথা আমি কহিতেছি তাহার রেল স্টেশন ও গৃহস্থ বসতির মাঝামাঝি বাজারখানি পড়ে। সেই স্থানে পহুঁছিলে অবধারিত চোখে পড়িবে, হাটের মাঝখানে গুড়ের পসরা সাজাইয়া বসিয়া আছে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। এঁর চেহারা-বসন আর পাঁচজন স্থানীয় মুদি-দোকানীর মত নহে। 

চক্ষু আপনার সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করে নাই। রথীন ভট্ট সত্যসত্যই অত্রকার আদি বাসিন্দা নহে। তাহার পরনেও খাটো ধুতি-ফতুয়ার পরিবর্তে আপিস কর্মচারীর ধোপদুরস্ত শেমিজ-পাতলুন। ইহার কারণ, রথীন ভট্টকে দশটা-পাঁচটার আপিস-কাছারির পর এই 

দোকান খুলিতে হয়। ইহার পিছনে এক ক্ষুদ্র ইতিহাস আছে। আজ সেই কথাই বলিব। 

জীবনের যে পর্যায়ে কুটাটিও ক্রীড়ার সামগ্রী হইয়া দাঁড়ায় সেই শৈশবেও রথীন ভট্টের খেলার দ্রব্যের বিলাসিতা সাজে নাই। বাংলাদেশে তাহাদের অবস্থা নিতান্ত খারাপ ছিল না। কিন্তু দাঙ্গার তরঙ্গ তাহাদিগকে আছড়াইয়া-ডুবাইয়া-ভাসাইয়া পশ্চিমবাংলার এপারে আনিয়া ফেলিল। চারিটি শিশু কোলে-কাঁখে মা এপারে ভাসিয়া উঠিলেন, বাপ রহিয়া গেলেন বেড়ার ঐপারে। সকলের মনে ডাঙায় ওঠা কইমাছের ন্যায় আশা জিয়ানো রহিল, ঝঞ্ঝা থামিয়া গেলে কিছু একটা ব্যবস্থা হইবে। 

কথায় বলে সমুদ্র কিছুই লহে না, সমস্তই ফিরাইয়া দেয়। বঙ্গভঙ্গের সমুদ্র তরঙ্গের পুনরাঘাতে তাহাদিগের পিতাকে পশ্চিমের এই পারে ফিরাইয়া দিল বটে, কিন্তু সে অনেক পরে। ততদিনে তাহাদিগের জীবন সংগ্রামের কেঁচেগণ্ডূষ হইয়াছে। একটি অসহায়া নারী ও তাঁহার চারিটি ক্ষুদ্র শিশু।  

কলিকাতা তাহাদিগের জীবন ফিরাইল বটে, কিন্তু যেন নূতন ক্রীড়নক পাইয়া এক বিপজ্জনক ক্রীড়ায় মাতিয়া উঠিল। দাবার ছক পড়িল। সেখানে পদে পদে জয়, পদে পদে পরাজয়। 

সংগ্রামের বিশদ ধারাবিবরণীতে যাইতেছি না। উহা আজিকার বার্তালাপের উপজীব্যও নহে। তথা ব্যতীত, অদ্যকার কোমলহৃদয় পাঠককুল অধিক দারিদ্র্য-দুর্দশা সহিতে পারেন না। শুধু এইটুকু কহিতে পারি, বিদ্যালয় চলাকালীনই রথীন ভট্টকে ঠোঙা বানাইয়া ও গৃহশিক্ষকতা করিয়া মায়ের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া সংসার প্রতিপালনের দায়িত্ব মাথায় তুলিয়া লহিতে হইয়াছিল। আর কহিতে পারি যে, রথীনের মাতা যখন ইহলোকের মায়া কাটাইয়া বৈতরণীর নৌকায় পাল জুতিতে ছিলেন তখন রথীন বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাহার মাতার অতি শখের মুড়ি-পাটালি জোগাড় করিতে পারে নাই। মুড়ি জোগাড় হইল, অবিশ্বাস্য হইলেও ইহা সত্য যে এক পয়সার পাটালির ঘাটতি রহিয়া গেল। ব্যর্থতার যন্ত্রণায় রথীন আর্দ্রচক্ষু ও চোয়াল শক্ত করিয়া রহিল। শুধু মুখে কিছু বিড়বিড় করিতে দেখা গেল। উহা অদৃষ্টের উদ্দেশ্যে অভিসম্পাত কি শপথ গ্রহণ তাহা ঠাহর হইল না। 

ইহার পরে অদৃষ্ট যেন নিজের অবিচারে লজ্জিত হইয়া রথীন ভট্টকে আলোর মুখ দেখাইল। সাফল্য রথীনের পানে ধাইয়া আসিল, রথীন গোগ্রাসে তাহা গিলিয়া চলিল। কেবল গলায় একটি কাঁটা বিঁধিয়া রহিল — মায়ের গুড়-পাটালির কাঁটা। 

নূতন চাকুরীর কারণে কলিকাতার পাট চুকাইয়া রথীন সাঁওতাল পরগণার এই গ্রামটিতে আসিল। থিতু হইতে যা সময় লাগে, তাহার পর এক অভিনব পরিকল্পনা তাহার মস্তিষ্ক প্রসূত হইল। চব্বিশ পরগণার সহিত কারবার করিয়া সে এই রুক্ষ ভূমির রসনাতে অমৃতের ন্যায় পাটালি গুড় ছড়াইয়া দিল। গুড়ের লোভে মক্ষীর ন্যায় মনুষ্য ভনভন করিতে লাগিল। বিপণীর শ্রীবৃদ্ধি হইতে অধিক বিলম্ব হইল না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াইল যে, দাম লইতে জানিলে চাকুরীর আর আবশ্যকতা থাকে না।  

ঈর্ষার স্থানমাহাত্ম্যের প্রয়োজন নাই। সে সর্বত্রই আপনার জাল বিস্তার করিতে পারে। কেহ কহিল, বাঙালী ব্যবসায়ের কী জানে? 

ব্যবসা দুই দিবসে লাটে উঠিবে। কেহ বলিল, “ব্যাটার ওপর চালাকি। তলে তলে কালোবাজারি চলিতেছে। লোভে পাপ।” 

কেবল পার্বণের দিবসে রথীন ভট্ট বিনামূল্যে কচিকাঁচাদের হস্তে অকাতরে পাটালি তুলিয়া দিতে দিতে তাহাদের হর্ষকে ছাপাইয়া হাসিয়া ওঠেন। তাহার চক্ষু স্থির ঊর্ধ্বপানে, আকাশের দিকে। চক্ষে জল টলটল করিতেছে। 

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Blog at WordPress.com.

Up ↑