নীলাঞ্জন চক্রবর্তী
ছোটবেলায় যখন বাবার হাত ধরে প্রথম কলকাতায় যাই তখন শিয়ালদা স্টেশনে নেমে ট্রামে করে কলেজ স্ট্রীট নামি। শিয়ালদা থেকে কলেজ স্ট্রীট হাঁটা পথ হওয়া সত্বেও ট্রামে চড়ি কারণ ট্রামে চড়ার শখ ছিল বহুদিন। বাবার মুখে যখনই কলকাতার কথা শুনেছি তার মধ্যে ট্রাম, টানা রিক্সা, কলেজ স্ট্রীটের কথা উঠে এসেছে। তাই ট্রামে চড়ে শখ পূরণ করে নিয়েছিলাম। ঘটাং ঘট ঘটাং ঘট অদ্ভূত শব্দ আর ঘণ্টার আওয়াজ সেই ছোটবেলায় রোমাঞ্চিত করেছিল। ছোটবেলা থেকেই তাই ট্রাম, স্মৃতিতে আবেগে জড়িয়ে আছে।
ফেব্রুয়ারি মাসটা নিঃশব্দে চলে গেলো, আমরা অনেকেই হয়ত খেয়াল রাখিনি, এই মাসের ২৪ তারিখ ১৮৭৩ সালে প্রথম কলকাতায় ট্রাম চলে। সে ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রাম, শিয়ালদা থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত। তখন ট্রাম পরিষেবা চালু ছিল মাত্র ৩.৯ কিলোমিটার রাস্তায়। এটা মনে রাখা প্রয়োজন, তখনকার কলকাতায় দ্রুত গতির গণ পরিবহন বলতে তেমন কিছুই ছিল না। পালকি, টমটম বা ঘোড়ার গাড়ি ছিলো। কিন্তু তাতে বেশি লোকও ধরত না তাই ইংরেজরা কলকাতায় ট্রামের প্রচলন করেন। তাতে তুলনামূলক দ্রুত যেত ও সঙ্গেও অনেক লোক যেতে পারত।
কিন্তু এত সত্বেও কিছুদিনের মধ্যেই ট্রাম পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয় যাত্রীর অভাবে।
এরপর লন্ডনে প্রতিষ্ঠা হয় CTC (Calcutta Tramways Company)। কলকাতায় ট্রাম পরিষেবা চালু রাখতে রাস্তায় ট্রামলাইন পাতা শুরু হয়।
এরপর পুনরায় ট্রাম চালু হয়, শিয়ালদা থেকে বউবাজার, সেখান থেকে ডালহৌসি হয়ে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত। এই ৩০ কিলোমিটার রাস্তায় তখন ট্রাম চলত। সেসময় ছিল এডওয়ার্ড লিটন-এর সময়কাল। রবীন্দ্রনাথ তখন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ করেছেন। কলকাতায় তখনও বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি, তাই ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলত। এক হাজার ঘোড়া ও একশো সাতাত্তরটি ট্রাম তখন নিয়মিত চলাচল করত কলকাতার বুকে। পরে আরো দ্রুত যাত্রী পরিবহনের কথা মাথায় রেখে স্টিম ইঞ্জিনের মাধ্যমে ট্রাম চালু করা হয়।
এর অনেক পরে ১৯০২ সালে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চালু হয়, ধর্মতলা থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত। এর থেকে বোঝা যায় সময় যত এগিয়েছে ট্রাম পরিষেবা তত আধুনিক হয়েছে। ধীরে ধীরে সমগ্র কলকাতায়, উত্তর থেকে দক্ষিণে ট্রাম চলাচল শুরু হয়ে যায়। ট্রাম, কলকাতাবাসীর পছন্দের গণপরিবহনে পরিণত হয়। এটা মনে রাখা প্রয়োজন তৎকালীন কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী। তাই কলকাতায় প্রথম ট্রাম চালু হবার পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য শহরেও ট্রাম পরিবহন সম্প্রসারণ হতে থাকে। ব্রিটিশ ভারতে মুম্বাই, চেন্নাই, কানপুর, দিল্লীতেও ট্রাম চলাচল শুরু হয়।
বিখ্যাত Burn Standard কোম্পানি থেকে তৈরী হত দু কামরার ট্রাম। এর গড় দৈর্ঘ্য ছিল ৬৪ ফুট, ওজনে প্রায় ২০ থেকে ২২ টন। ফার্স্ট ক্লাস আর সেকেন্ড ক্লাস এই দুই কামরা। ফার্স্ট ক্লাস কামরায় পাখা থাকার কারণে সেকেন্ড ক্লাসের থেকে ভাড়া ছিল বেশি। ব্রিটিশ আমলে প্রথম শ্রেণীর কামরা মূলতঃ ইংরেজদের জন্যই বরাদ্দ ছিল।
নদী থেকে অনেক জল বয়ে গেল, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, জালিয়ানওয়ালাবাগ, রবিঠাকুরের নাইট উপাধি ত্যাগ পেরিয়ে মহাত্মা গান্ধীর উত্থান সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল কল্লোলিনী কলকাতা। সময় বদলানোর পাশাপাশি কলকাতা অনেক গতিশীল হল, বাস–ট্যাক্সির মত গতিশীল যানবাহনও কলকাতার রাস্তায় চলতে শুরু করে। যে গতির জন্য ট্রামের উৎপত্তি সেই গতির কাছেই সে হেরে যেতে শুরু করে। জনমানবের পছন্দের তালিকা থেকে সরে যেতে থাকে ট্রাম। দেশের অন্যান্য শহর থেকে ট্রাম পরিবহন উঠে যায় ধীরে ধীরে। কলকাতা তার নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রাখলেও যদিও গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না, তা সত্ত্বেও ট্রাম টিঁকে যায় এই শহরের বুকে দশকের পর দশক।
স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রামের দায়িত্বভার গ্রহন করে ১৯৫১ সাল নাগাদ। ১৯৫৯-এ ট্রামের ভাড়া বৃদ্ধির জন্য জনগণের বিক্ষোভ বৃহৎ আকার নিয়েছিল। তখনও ট্রামের প্রয়োজনীয়তা কলকাতার মানুষের কাছে ফুরিয়ে যায়নি। কিন্তু পরের দিকে বাংলার শাসক দলের অমনোযোগিতা, ট্রামের ধীর গতি ও সর্বোপরি কলকাতার মানুষের থেকে গুরুত্বের অভাব ট্রাম কে পেছনের সারিতে ফেলে দেয়।
পরের দিকে অবশ্য ১৯৮৫ সালে পুনরায় ট্রাম লাইন পাতা হয় মানিকতলা থেকে উল্টাডাঙ্গা পর্যন্ত। তারপর আবার ১৯৮৬ সালে বেহালা থেকে জোকা অব্দি নতুন দুটো রুট তৈরী হয় ট্রাম পরিষেবা সচল রাখার জন্য। কিন্তু যা ঘুণ ধরার তা ধরে গেছে এতদিনে, এর আগেও কিছু ট্রাম রুট তুলে নেওয়া হয়েছে, যাত্রী সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ফলে ট্রাম পরিবহন লোকসানে পড়ে যায়। এরপরের ইতিহাস আরো করুণ। বেনোজল যখন একবার ঢোকে সেই জল আর সহজে আটকানো যায় না। ট্রামের হাল ঠিক করার জন্য CTC বাস চালানো শুরু করে ১৯৯১ থেকে। ক্রমে যত সময় এগিয়েছে শহরাঞ্চলে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত হারে বেড়েছে ফলে মন্থর গতির ট্রাম জ্যাম যানজট সৃষ্টি করতে থাকে স্বাভাবিক কারণে। ফলে আরো অনেক রুট তুলে নেওয়া হয়। এরপর মেট্রো রেল আসার কারণে ট্রাম পরিষেবা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকে।
ভাবতে অবাক লাগে, শহরের এমন একটি প্রাচীন পরিবেশবান্ধব যান, যার কিনা দুর্ঘটনা ঘটার পরিসংখ্যান খুব সামান্য হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র। বৃদ্ধ বয়স্ক, প্রসূতিদের চলাফেরার জন্য আদর্শ এবং স্বল্প মূল্যের ভাড়া থাকা সত্ত্বেও ট্রাম আজ শুধুমাত্র কম গতির জন্য উঠে যেতে বসেছে। অথচ যারা এককালে এখানে ট্রাম পরিবহন চালু করেছিল তাদের দেশে এখনো ট্রাম চালু আছে পুরোদমে। ইংল্যান্ডে গেলে এখনো ট্রাম, ডবল ডেকার বাস, টেলিফোন বুথ (ডায়াল ঘোরানো) দেখতে পাওয়া যায়। অথচ সেখানে মেট্রো রেলও চালু আছে নব্বই বছর। আমাদের থেকে অনেক আধুনিক তারা। সবই চলেছে সেখানে তার নিজস্ব স্বকীয়তায়। শুধু ইংল্যান্ড বলে নয়, জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনার মতো দেশেও ট্রাম পরিষেবা চালু আছে। অনেক দেশে আবার পরিবেশবান্ধব যান বলে নতুন করে ট্রাম চালু করেছে সেখানকার সরকার। অথচ আমাদের শহরে সরকারের যেমন কোনো হেলদোল নেই তেমনি আমাদের শহরের মানুষেরাও চায়না তার ঐতিহ্য বজায় রাখতে।
এখনো কলকাতার রাস্তায় ট্রাম চলে কিন্তু খুব সামান্য কয়েকটা রুটে। ট্রামের সংখ্যাও এখন প্রায় সত্তরে এসে ঠেকেছে। সত্যি বলতে ট্রাম কোম্পানির সূর্য এখন অস্তাচলে প্রায়, হয়ত আগামী প্রজন্মকে ট্রাম দেখতে গেলে মিউজিয়ামে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।




এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান