কস্তুরি ব্যানার্জী
আচ্ছা বলুন তো…বাই উঠলেই যে সবসময় কটকেই যেতে হবে তার কি কোনও মানে আছে? আর তাছাড়া শিলিগুড়ি থেকে কটক যাওয়া অত সহজও নয়। তার চেয়ে বরং পাহাড়, জঙ্গল, নদী, চা বাগান একদম হাতের কাছে। আর বাঙালির পায়ের তলায় যখন সর্ষে আমরাই বা তার ব্যতিক্রম হই কী করে! তাই বেশ কয়েক বছর আগে এক শনিবারের দুপুরে বর যখন অফিস থেকে ফোন করে রেডি হতে বলল তখন সাতপাঁচ না ভেবে….. কোথায় যাচ্ছি কিছুই না জেনে ব্যাগপত্তর গোছাতে শুরু করলাম। রান্নাবান্না সব রইল পড়ে… যা ছিল সব ফ্রিজে ঢুকিয়ে “চলো লেটস গো,” বলে বেরিয়ে পরলাম।
শীতের বেলা। চারটে পরিবার মিলে বিকেল পাঁচটাতে যখন রওনা দিলাম সূর্য তখন পাটে চলে গেছে। একটা টাটা সুমোতে সাড়ে দশ জন আর ব্যাগপত্তর নিয়ে ঠেসেঠুসে সেট হয়ে গেছি। সেবকের জঙ্গলের পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি চাপ চাপ অন্ধকার চারিদিকে। চোখ কাজ না করলেও নাকে এল জঙ্গল আর পাহাড়ের বুনো…মন ভাল করা নেশার মত গন্ধটা। তখনই জানতে পারলাম চলেছি লাটাগুড়ি পেরিয়ে নেওড়া নদীর ধারে একটা রিসর্টে। করোনেশন ব্রিজ পেরিয়ে পাহাড় টপকে যখন মালবাজারের রাস্তা ধরেছি ঘড়ির কাঁটা তখন ছ’টা পেরিয়ে গেছে। মাখনের মত রাস্তা….দু’ধারে রিফ্লেক্টর দেখে মনে হচ্ছে যেন দীপাবলির রাত…সার দিয়ে প্রদীপ জ্বলছে।
লিস, ঘিস, চেল নদী পেরিয়ে মালবাজারে এসে যখন পৌঁছালাম সাতটা বেজে গেছে। লাটাগুড়ি বাজার থেকে বেশ কিছুটা ভিতরে যখন ঢুকেছি, শুনশান চারিদিক তখন। রাস্তাতেও আলো খুবই কম। রাস্তার অবস্থাও তথৈবচ। একদম অজানা গন্তব্য। এইভাবে কোনোদিন বের হইনি… বেশ থ্রিলিং লাগছে। দূরে হঠাৎ দেখি টং ঘর…রাত দুপুরে ফসল খেতে আসা হাতিদের তাড়ানোর ঘর। এতদিন নাম শুনেছি…আজ দেখলাম। শুনলাম কাছেই নদী আর ওপারে ঘন জঙ্গল….শুনলামই শুধু…চোখে কিছুই ধরা দিল না…এতটাই ঘন অন্ধকার।
দূরে রিসর্টটাকে যখন দেখতে পেলাম মনটা ভাললাগায় ভরে গেল। চারপাশ শুনশান। একটি মাত্র থাকার জায়গা। বহুদিনের শখ ছিল এইরকম রিমোট একটা জায়গাতে থাকব। তারপর শুনলাম রাতের দিকে জঙ্গল থেকে হাতি বেরিয়ে আসে নদী থেকে জল খেতে।
নিকষ কালো অন্ধকার….আকাশের চাঁদটাও যেন লজ্জা পেয়ে মেঘের বুকে মুখ লুকিয়েছে….চারপাশে ঝিঁঝিঁ আর নাম না জানা পোকার ডাক…..রিসর্টের বাইরে টিমটিম করে আলো জ্বলছে…পরিবেশের সঙ্গে একদম মানানসই। রিসর্টের চারপাশের বেড়াও বেশ নড়বড়ে। ভয় ভয় আছি….ভিতরেও কি এমনই ব্যবস্থা! কিন্তু ভিতরে ঢুকে চক্ষু চড়কগাছ! একদম ঝাঁ ঝকঝকে রিসেপশন, রুম, খাওয়ার জায়গা। এলাহি খাওয়ার আয়োজন।
ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে যখন ছাদে উঠেছি চাঁদের আলোও দেখতে পাচ্ছি না.…. কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবুও অন্ধকারেরও একটা পর্দা থাকে। বেশ কিছুক্ষণ থাকার পরে সেই পর্দাটা ছিঁড়ে গিয়ে আবছা আবছা দৃশ্য চোখে এসে ধরা দেয়। আর ঠিক সেই কারণেই নদী….তার ওপারে ঘন জঙ্গল সবই আস্তে আস্তে চোখের সামনে ফুটে উঠছে। এই রাতের দ্বিতীয় প্রহর তাদের দল বেঁধে বেরোনোর সময়। দূর থেকে ভেসে আসছে ডাক। সেই কোন ছোটবেলায় পড়েছিলাম হাতির ডাককে বৃ্ংহণ বলে….আজ তা কানে এসে পৌঁছাল। খুব কাছে এসে গেছে তারা .……আওয়াজই তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। বন্ধুর ছোট্ট ছেলের তো তা শুনেই পটি পেয়ে গেল….বড্ড ছোট কিনা! আমাদেরই হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার জোগাড়….বেড়ার যা চেহারা দেখে এসেছি নীচে! কথা বলে সেই রোমাঞ্চকর পরিবেশ নষ্ট করতে কেউই চাইছি না…তাই যেটুকু কথাবার্তা হচ্ছে সবই ফিসফিস করে।
সারা রাত ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম আর থেকে থেকে হাতির ডাক..…জানান দিচ্ছে ‘আমরা আছি আশেপাশেই !
প্রমাণ পেলাম পরেরদিন ভোরবেলা নদীর ধারে সূর্য ওঠা দেখতে গিয়ে। পায়ের ছাপ আর তাদের পটি বুঝিয়ে দিচ্ছে রিসর্টের একদম কাছেই চলে এসেছিল আমাদের সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু আমরাই ঠিকমত অতিথিদের আপ্যায়ন করতে পারিনি।
সারাদিন নদীর ধারে কাটিয়ে ভরপুর পেটপুজো করে যখন বাড়ির পথ ধরেছি গোধূলির কনে দেখা আলো ছড়িয়ে পড়েছে জঙ্গলের গাছের ফাঁকে ফাঁকে..….নদীর জলের গভীরে…পাথর, বালির কণায় কণায়। ধানের ক্ষেতে সেই আলো পড়ে আরও হলুদ হয়ে গেছে। বিকেলের এই মনকেমনের আলো গায়ে মেখে ধান খেতে চলে এসেছে ময়ূরের দল। ছবি তুলতে যাদের ভারী অনীহা….লম্বা পেখম নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গীতে নেচে বেড়াচ্ছে সারা ক্ষেত জুড়ে। মনপ্রাণ ভরে শেষ বিকেলের ভাললাগাটুকু নিয়ে আর অনেকখানি অক্সিজেন স্টোর করে ফিরে চললাম আবার যার যার বাক্স বন্দী ফ্ল্যাটে।




এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান