অনিন্দিতা মণ্ডল
(৭)
চিঠিটা হাতে নিয়ে বসেছিলেন স্নেহময়। বহু বছর আগের একটা হলদে হয়ে যাওয়া নীল খামের থেকে অন্য একটা চিঠি বার করে দেখছিলেন।
“ছোটকা, দূরে চলে যাচ্ছি। তোমাদের আর কখনও দেখতে পাব না, এই কষ্ট কম নয়। বাবা মা এমন শাস্তি উচ্চারণ করার আগে একবার ভাবলেন না! বিচার করা সোজা নয় তো! তুমি লিখেছ শিশির শুভার দায়িত্ব নেবে না বলেছে। বলেছে, নিজের বোন বলে ভাবতেও লজ্জা করে। কেন? শুভা ঠিক কী করেছে বলো তো? আমি জানি একমাত্র তুমিই জানবে অনুভব করবে। তার অপরাধ কীসে? আমি তো জানতেই পারিনি! সেদিনের ছোট্ট শুভা এমন অদ্ভুত এক কথা তোমাকে বলেছিল! যে কথাটা বলার। আমিই শুভার দায়িত্ব নিলাম। প্রতি মাসে ওর নামে টাকা পৌঁছে যাবে। তুমি পোস্ট অফিসে ওকে খাতা খুলে দিও। বেচারি শুভা তো বাড়ির গণ্ডি ছেড়ে এর চেয়ে বেশি বাইরে যেতে পারবে না।
তুমি আমার অনেক ভালোবাসা নাও। প্রণামের চেয়ে শ্রদ্ধার চেয়ে ভালবাসা বেশি আমার কাছে।
ইতি
অরুণ”
স্নেহময় দেখছিলেন চিঠিটা। কিছুদিন হল তাঁর মনের মধ্যে একটা অন্য চিন্তা বাসা বেঁধেছিল। অরুণের বয়স কম হল না। একা একা প্রবাসে। ও কি কখনও এ বাড়িতে ফিরবে না? একদিনের জন্যেও নয়? কত পাখি আকাশে ওড়ে। তারাও তো একবার বাসায় ফেরে! অরুণকে কতকাল দেখেন না! কষ্ট হয়। সায়নের চেয়ে কোনো অংশে কম ভালবাসেননি তো! বুকের মধ্যে চিনচিন করে ওঠে। আর তখনই স্থির করেছিলেন। সিদ্ধান্ত তাঁকেই নিতে হবে। তিন দাদার কেউ বেঁচে নেই। বড় আর মেজ বউদিও গত। অতএব এবার জরুরি কাজটা সারতেই হবে। কত অভিমান বুকে রাখতে পারে একটা মানুষ?
চিঠি দিয়েছিলেন অরুণকে। বিদেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত সে। ঠিকানা পাওয়া কঠিন নয়। চিঠি লিখে দিলে সায়ন পোস্ট করেছিল। লেখার পর কেটে গিয়েছে আরও একটি বছর। তিনি ভেবেছিলেন অরুণ হয়ত ওই ঠিকানায় নেই আর। চিঠি সে পায়নি।
এতদিনে অরুণের চিঠি এসেছে।
“ছোটকা! চিঠিতে বাড়ির গন্ধ!” আরও অনেক কিছু লিখেছে অরুণ। কিন্তু স্নেহময়ের চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে।
পল্টু অনেক ইঁট ফেলেছে। সিমেন্ট বালিও আসছে। বিশেন রাজমিস্ত্রি এসে কথা বলে গেছে। বড়দাদের অংশটা অব্যবহারে বেশি জীর্ণ হচ্ছে। সারাতে হবে। স্নেহময় নিজে দাঁড়িয়ে কত তদারক করবেন? শ্রী সেদিন জলখাবার নিয়ে এসে দাঁড়াতেই স্নেহময় বললেন, “বিশেন মিস্তিরি এসেছে। বড়দাদের অংশ সারানো হবে। দেখাশুনো তুমি করবে। পারবে তো? জানি জানি। রান্নাঘর। ওটা উমা দেখবে। আমি কথা বলে রেখেছি। তুমি শুধু আমাকে খেতে দেবে। ওষুধ দেবে, ব্যাস। ও বাড়িটা সারাতে হবে। শিগগিরি।”
শ্রী হতবাক। –”আমি পারব?” স্নেহময় বড় বড় চোখে তাকালেন – ‘পারবে না মানে? আলবাত পারবে!”
ধীরে ধীরে নোনা পুকুরধার, আগাছা, কলমির ঝাড় সব পরিষ্কার হতে লাগল। মেরামতি করতে করতে বিশেন মিস্তিরি কবেকার সব পুরনো গল্প করতে থাকল। যখন বিশেন রোজ রোজ বাড়িতে আসত, রোজ মিস্তিরি কাজ করত। শ্রীয়ের দিন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। শুভা সন্ধের আগে পুকুরে নামতে পারে না। শ্রীকে বলে, “কী শুরু করলে? ছোটকা হঠাৎ সব সারাতে সুরোতে লেগেছে কেন? সব সারানো যায়? সব কি ফেরে? মাঝখান থেকে আমার পুকুর কেড়ে নিলে?”
শ্রী একদিন হেসে বলল,”তুমি তো বাবাকে একটা নালিশ জানাতে পারো শুভাদিদি? এরা তোমার পুকুর নিয়ে নিচ্ছে।”
শুভা দুঃখ পায় – “তুমি কী করে জানবে? এরা কোথাও এতটুকু জল আমার জন্য রাখেনি। আমার সব কেড়ে নিয়েছে। শুকনো জীবন বাঁচা যায় শ্রী?”
স্নেহময়কে বলেছিল শ্রী। স্নেহময় হেসেছিলেন, “পাগল মেয়ে। ওকে ডেকে এনো তো? অনেকদিন কাছ থেকে দেখি না। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।”
স্বাতী সেদিন চৌকিতে পা মেলে বসে কুটনো কুটছিলেন। শ্রীয়ের ওপরে খুব রাগ তাঁর। কেন? স্নেহময়কে বলতে পারেনি? রান্না উমা কেন করবে? ঘরের বউ মিস্তিরি খাটাবে কেন? তাও ওদিকে কার জন্যে এসব হচ্ছে শুনি? স্বাতী তো কিছুই জানেন না! এর মধ্যে আবার শ্রীয়ের সঙ্গে পায়ে পায়ে শুভা এল। হ্যাঁ, মেয়েটা দুর্ভাগা। কিন্তু তাই বলে সোজা ওপরে? স্নেহময়ের কাছে? স্বাতী আটকালেন, “ওপরে কী করতে যাচ্ছ শ্রী?”
– “বাবা শুভাদিদিকে ডেকে আনতে বলেছেন।”
স্বাতীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দের মধ্যে দুজনে ওপরে উঠল। স্নেহময় খাটে বসেছিলেন। একটা কাগজ হাতে ধরা। শ্রীয়ের দিকে এগিয়ে ধরলেন – “পড়ো। রমেন্দ্র লিখেছেন।”
শ্রী পড়ছে,
“ঘরে আমি থাকতে চাই না
স্বভাব মরে না বলে
ফিরে ফিরে আসি।
আমি বার বার ঠকে যাই, তবু
ঘুমন্ত বালিশে আজও লতাপাতা মুখচ্ছবি আঁকি
যেন সেই ভিনগাঁর ফলের বাগানে
আমের মঞ্জরি হাতে অপেক্ষায় কেউ।
আমি বাড়িতে থাকব না।
তবে বাড়ি বানালুম কেন?
হরিপদ, বন্ধু শোনো
বাড়িতে থাকব না বলে সুন্দর এ বাড়ি বানালুম…।”
পড়া শেষ হলে শ্রী চুপ করে গেল। স্নেহময়ও চুপ। শুভা নিস্তব্ধতা ভাঙল – “ছোটকা ডেকেছিলেন?” স্নেহময় তাকালেন। শুভার রগের পাশে চুলে পাতলা হয়েছে। মাথার মাঝে সিঁথি চওড়া হচ্ছে। একটু কি রোগা হয়েছে শুভা? ওপর থেকে বোঝা যায় না। স্নেহময় কাছে ডাকলেন, কাছে আয় শুভা। পাশে বসিয়ে মাথায় হাত রাখলেন। – “বাড়ি সারাচ্ছি কেন বল তো? অরুণ আসছে।”
চমকে উঠেছে শ্রী ও শুভা। শুভার মুখ থেকে ছিটকে এল – “কেন ছোটকা? এ বাড়িতে কেন? নিজেকে এত ছোট করতে আছে?”
স্নেহময়ের চোখের কোণে জল জমছে। – “শ্রী, রমেন্দ্র কী লিখেছে পড়লে? বাড়িতে থাকব না বলে সুন্দর এ বাড়ি বানালুম। কেউ তো থাকব না। শুভা, তোর পুকুর তোর ঘরদুয়ার কিছুই চিরকালের নয় তো! তাহলে অপমান চিরকালের কেন হবে বলতে পারিস?”
শুভা কাঁদছে। এতদিন তো কারো সামনে আসেনি, কাঁদেনি। কত বছর পর ছোটকার সামনে। ছোটকা কেন ডাকেনি এতদিন? ছোটকা কী সুন্দর দেখতে ছিলেন! ছোটমা রূপের জন্য কত সন্দেহ করেছে! কিন্তু ছোটকার সোনায় বাঁধানো মন। সেই একদিন। পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল। আকাশ ভেঙে পড়েছিল। নিজের বাবা মা আলাদা ঘর দিয়ে পৃথক করেছিল। কেউ কথা বলত না। ছোটকা কেন ডাকেননি তখন? প্রথম সেই প্রলয়ের দিনে শুধু বলেছিলেন, শুভা হাত ছেড়ে দে। ভালবাসলেই বাঁধতে হয় এ কোথায় শিখেছিস? আর আজ বলছেন, এ বাড়ি এ পরিবার সুন্দর হোক, তবু এখানে চিরকাল কেউ থাকব না। অপমান অভিমান কিছুই চিরকালের জন্য নয়। হঠাত ছোটকা এমন বলছেন কেন? সেদিন কেন বলেননি?
“বাড়িতে কে থাকবে না এখনই? এতদিন পর দাদাভাই এখানে আসছে কেন?” এই শেষ প্রশ্নটা মুখ থেকে বেরিয়ে গেল শুভার।
স্নেহময় শূন্য চোখে তাকিয়ে ছিলেন – “অরুণের এখানে আসার থাকার অধিকার আছে শুভা। সে বিনা অপরাধে শাস্তি পেয়েছে। তোরও অপরাধ দেখিনি আমি। বরং বিচারটা ঠিক ঠিক হওয়া উচিত ছিল।”
– “এতদিন হয়নি কেন ছোটকা?”
– “আমি বুঝিনি বলে শুভা। রমেন্দ্র বোঝালেন। তাঁর কবিতায় আমি নিজেকে দেখতে পেলাম। নিজের অপরাধ দেখতে পেলাম। বীতশোক শুধু বলে রমেন্দ্র দুর্বোধ্য। কিন্তু রমেন্দ্র আরশি। আরশিনগরের কবি আরশি মেলেছেন। এখন তুই মেনে নে শুভা। অরুণ ফিরুক।”
(চলবে)…
(স্নেহময়ের নিজের লেখা কবিতা ছাড়া বাকি কবিতা কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরীর কিছু কবিতা থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।)




এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান